ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির নেতা ইশরাক হোসেনের শপথগ্রহণ ইস্যু ঘিরে চলছে রাজনৈতিক অচলাবস্থা। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অথচ আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতাই প্রধান বাধা। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে নতুন প্রশ্ন—এটা আইন না কি ক্ষমতার খেলা?

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) ভবন এখন আর শুধুই একটি প্রশাসনিক দপ্তর নয়—এটি বর্তমানে একটি রাজনৈতিক প্রতীক, প্রতিরোধ ও দাবি আদায়ের চিত্ররূপে পরিণত হয়েছে। ‘ঢাকাবাসী’ ব্যানারে বিএনপির নেতা ইশরাক হোসেনের সমর্থকরা ষষ্ঠ দিনের মতো অবস্থান করছেন নগর ভবনের মূল ফটকে তালা লাগিয়ে। তাদের দাবি, হাইকোর্ট ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুসারে ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে শপথ নিতে দেওয়া হোক।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ‘ইচ্ছাকৃতভাবে’ আদালতের রায় ও গেজেট থাকা সত্ত্বেও শপথ গ্রহণে বাধা দিচ্ছেন। এর জবাবে সোমবার বিকেলে আসিফ তাঁর ফেসবুক পোস্টে ১০টি দৃষ্টিকোণ থেকে আইনি জটিলতা তুলে ধরেন, যা এ আন্দোলনের নেপথ্য বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
উপদেষ্টার বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে:
–আর্জি সংশোধন বিষয়ে হাইকোর্টের রায় লঙ্ঘন করে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত: এটি একটি গুরুতর আইনি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, যা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
-নির্বাচন কমিশনের গেজেটের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ: আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত ছাড়া ও রাতে তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ, দুইজন নাগরিকের পাঠানো লিগ্যাল নোটিশ অগ্রাহ্য করার দৃষ্টান্ত, প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
–স্থানীয় সরকার বিভাগের কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা নেই: তাই তাদের শপথ গ্রহণে বিলম্ব ঘটানো আইনবহির্ভূত বলা চলে না।
–মেয়াদ সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা: মেয়রের কার্যকাল আদৌ আছে কি না—এই প্রশ্ন এখনো নিরসিত নয়।
এসব আইনি বিষয় সঠিকভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত শপথ গ্রহণ প্রক্রিয়া আটকে থাকার যুক্তি কতটা অযৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
নগর ভবনের প্রধান ফটকে তালা দেওয়া ও বিক্ষোভ চলতে থাকায় ডিএসসিসির দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। নাগরিক সেবা যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ট্রেড লাইসেন্স প্রদান, নগর ব্যবস্থাপনা কাজগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই অবস্থান কর্মসূচির নেপথ্যে ‘দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা ও গোয়েন্দা তথ্য’ রয়েছে বলেও আসিফের দাবি, যা এটিকে ‘সাধারণ জনগণের আন্দোলন’ নয়, বরং রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে চিহ্নিত করে।
প্রশ্ন উঠছে আওয়ামী নির্বাচনের বৈধতা নিয়েও
উপদেষ্টার একটি বক্তব্য উল্লেখযোগ্য:
“আওয়ামী আমলের অবৈধ নির্বাচনগুলোকে বৈধতা দেওয়ার প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।”
এই বক্তব্য শুধু ইশরাক ইস্যু নয়, সামগ্রিকভাবে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনের বৈধতা, অংশগ্রহণহীন ভোট, প্রহসনের নির্বাচন ইত্যাদিকে নতুন আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসছে।
ডিএসসিসির এই অবরোধ একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য আন্দোলন, না কি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরির কৌশল—এই প্রশ্ন এখন উঠছে। উচ্চ আদালতে বিচারাধীন অবস্থায় এবং আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত ছাড়া একতরফা দাবি আদায় কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
তবে এটাও সত্য, একটি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে শপথ না নিতে দেওয়াও গণতন্ত্রের ভিত্তির বিপরীত। এই সংকট রাজনৈতিক সংলাপ, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং আইনি প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে সমাধান না হলে, এর প্রতিফলন ভবিষ্যতের রাজনীতিতে আরও গভীর মেরুকরণ তৈরি করতে পারে।
