রাখাইনে মানবিক করিডোর ও চট্টগ্রাম বন্দরের বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীতে বিভাজন তৈরির অভিযোগ উঠেছে ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার ভূমিকা ঘিরেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।

বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে টানাপোড়েন যেন এক নতুন মাত্রা পেয়েছে রাখাইন করিডোর ও চট্টগ্রাম বন্দরের বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দেওয়া নিয়ে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে গৃহীত কিছু সিদ্ধান্ত এখন শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, বরং দেশের প্রতিরক্ষা বলয়ের অভ্যন্তরেও অস্থিরতার বীজ বপন করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত বিতর্কিত সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল যে, জাতীয় স্বার্থের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র—বিশেষ করে সেন্টমার্টিন দ্বীপ ও চট্টগ্রাম বন্দর—বিদেশি প্রভাবের অধীনে চলে যেতে পারে। সেই আশঙ্কা মিথ্যা প্রমাণ করতে পারেনি বর্তমান ইউনূস সরকার। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে।
জাতিসংঘের একটি প্রস্তাবের আলোকে ড. ইউনূস সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের রাখাইনে একটি “মানবিক করিডোর” তৈরির পরিকল্পনা সামনে এসেছে। তবে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুধু মানবিক নয়, বরং ভূরাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ—বিশেষ করে যখন তা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততায় ঘটতে যাচ্ছে।
রাখাইনভিত্তিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মিকে সহায়তা দেওয়ার গোপন পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের বিরুদ্ধে। তিনি এক সময় মার্কিন প্রভাববলয়ের অংশ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং বর্তমানে দ্বৈত নাগরিকত্ব বহন করছেন। তার এমন ভূমিকা সেনাবাহিনীর ভেতরে বিভ্রান্তি ও দ্বন্দ্ব তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের আগস্ট থেকে দায়িত্ব পালনরত সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান যেভাবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রেখেছেন, তা প্রশংসনীয়। কিন্তু সরকারে খলিলুর রহমানের অন্তর্ভুক্তি ও তার প্রস্তাবিত “সামরিক সচিবালয়” গঠনের পরিকল্পনা সেনাপ্রধানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে গিয়ে ঠেকেছে।
খলিলুর রহমান চাইছিলেন ২০-২৫ জন ব্রিগেডিয়ার ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল তার অধীনে নিয়োগ দেওয়া হোক। সেনাবাহিনী এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে, যা থেকেই শুরু হয় অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের সূত্রপাত। একাধিক ইউনিট সেনাপ্রধান ওয়াকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলেও, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু ইউনিট একপ্রকার দ্বিমত পোষণ করে চলেছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে ১০ম পদাতিক ডিভিশনের কিছু ইউনিট রাখাইনের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে জান্তা বাহিনীর গুলিবর্ষণে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ঘটনার দায়ে এএফডির প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানের নাম সামনে এলেও, বিষয়টি চেপে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা—বাংলাদেশকে ভূরাজনৈতিক সংঘাতে টেনে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, যার পরিণতি মারাত্মক হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তত্ত্বাবধানে বিদেশি কর্তৃপক্ষকে যুক্ত করার প্রস্তাবনা সম্প্রতি ড. ইউনূস সরাসরি প্রকাশ্যে আনেন। এই ঘোষণার ফলে আবারও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সমুদ্র বন্দর ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই বন্দর শুধু অর্থনৈতিক না, বরং প্রতিরক্ষাগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এনসিপি নামের অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নেতারা সেনাপ্রধানকে লক্ষ্য করে একাধিকবার অবমাননাকর ভাষায় কথা বললেও সরকারিভাবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং ধারণা করা হচ্ছে, আন্দোলনে নামিয়ে তাদের ব্যবহার করে সেনাবাহিনীকে চাপে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে ইউনূস সরকার।
জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যে দ্বিধা ও বিভাজন তৈরি হয়েছে, তা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত। রাখাইন করিডোরের মতো উদ্যোগ মানবিক রূপে উপস্থাপন করা হলেও এর ভূরাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা-সম্পৃক্ত দিক বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, এটি কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ নীতি নয়—বড় ধরনের আন্তর্জাতিক গেমের অংশ।
একদিকে সেনাবাহিনীর অব্যাহত সমর্থন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জেনারেল ওয়াকার, অন্যদিকে বিদেশি সংশ্লিষ্টতা নিয়ে বিতর্কিত ভূমিকা পালন করা নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান ও ড. ইউনূসের সরকার—বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন এই দ্বন্দ্বের গতি-প্রকৃতির ওপরই অনেকটাই নির্ভর করছে।
