অন্তর্বর্তী সরকারের ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম এনসিপির কেউ নন—ঘোষণা করেছেন আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

বাংলাদেশের চলমান অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই ছাত্র উপদেষ্টার পরিচয় নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলম—দুই তরুণ, যারা দেশের গণআন্দোলনের সময় রাজপথে সরব ছিলেন, বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু বিএনপির একাধিক নেতার অভিযোগ অনুযায়ী, তারা নাকি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র লোক।
এই প্রেক্ষাপটে আজ (২৪ মে ২০২৫) এনসিপি আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরাসরি এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন—”এই দুজন এনসিপির কেউ নন। তারা গণঅভ্যুত্থানের প্রতিনিধি হিসেবে সরকারে রয়েছেন। আমিও তাদের মধ্যে একজন ছিলাম।”
নাহিদের বক্তব্য থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার: অন্তর্বর্তী সরকারের গঠনে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের সবাই কোনো নির্দিষ্ট দলের প্রতিনিধিত্ব করেন না। বরং তারা সরকারে এসেছেন গণআন্দোলনের নৈতিক দাবির প্রতিনিধিত্ব করতে।
তা সত্ত্বেও বিএনপি কেন তাদের এনসিপির সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস চালাচ্ছে? এর পেছনে কি শুধুই রাজনৈতিক সন্দেহ, নাকি ছাত্র রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার একটি কৌশল?
বিএনপি বরাবরই অন্তর্বর্তী সরকারে নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় অংশগ্রহণের দাবি জানিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন তারা তরুণ প্রতিনিধিদের পেছনে রাজনৈতিক পরিচয়ের ছায়া খুঁজছে। এটি এক ধরনের দ্বৈতনীতি কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নাহিদের বক্তব্যের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, তিনি নিজেও ছাত্র আন্দোলনের একজন নেতা ছিলেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের গঠনের সময় একধরনের ‘জনতার প্রতিনিধি’ হিসেবেই ছিলেন। এখন তিনি নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বলছেন, “যদি কেউ রাজনীতি করতে চায়, তাহলে সরকারে থেকে তা সম্ভব নয়।” এটি এক ধরনের ‘নৈতিক রেখা’ টানার প্রয়াস।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, গণআন্দোলনের প্রতিনিধিরা রাজনৈতিক দলে পরিণত হলে তাদের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একদিকে যেমন গণঅভ্যুত্থান থেকে আসা নেতারা নিজেদের পরিপার্শ্বে সংগঠন গড়ছেন, অন্যদিকে পুরনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাদের ‘তৃতীয় পক্ষ’ বলে চিহ্নিত করতে চাইছে। এই টানাপোড়েনের মাঝেই তৈরি হচ্ছে একটি নতুন ধরনের ছাত্র রাজনীতি—যা প্রক্সির মাধ্যমে আদর্শ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বে পরিণত হয়েছে।
সরকার থেকে বের হওয়া না হওয়া: সিদ্ধান্ত কার?
নাহিদ ইসলাম নিজেই বলেছেন, সরকার থেকে কবে বের হবেন বা আদৌ হবেন কি না, সেটা সিদ্ধান্ত নেবেন ওই দুই উপদেষ্টা নিজেই। এটিই বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে থাকা সবচেয়ে স্পষ্ট প্রশ্ন।
যদি তারা শুধুই আহত আন্দোলনকারীদের পুনর্বাসন ও বিচার তদারকির জন্য সরকারে থাকেন, তবে রাজনৈতিক সংশ্লেষ কেন?
এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিচ্ছে বিএনপি—তাদের দাবি, এনসিপি সরকারের সঙ্গে আঁতাত করেছে। আর এনসিপি বলছে, এটি রাজনৈতিক অপপ্রচার। এই বিতর্কের মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে একটি বিষয়: তরুণ নেতাদের ওপর রাজনৈতিক বলয়ের নিয়ন্ত্রণের লড়াই আরও তীব্র হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—যাদের আন্দোলনের মূলে রেখেই সরকার গঠিত, তাদের প্রতিনিধি থাকাটাই কি অস্বাভাবিক? নাকি আন্দোলনের ফসল ভোগ করার ক্ষেত্রে ‘পছন্দের মানুষ’ না থাকলে সমালোচনা অনিবার্য?
ছাত্র উপদেষ্টাদের পরিচয় এবং সরকারের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক রাজনৈতিক মাঠের নতুন তর্ক। নাহিদ ইসলামের বক্তব্য হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতির চাপ কমাবে, তবে এটি দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বিভাজন, বিশ্বাসযোগ্যতা ও ‘নিরপেক্ষতা’র ধারণাকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা সময়ই বলে দেবে।
সরকার ও গণআন্দোলনের মধ্যকার সম্পর্কের এই নতুন মাত্রা শুধু ক্ষমতার ব্যালান্স নয়, গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতেরও বার্তা বহন করছে।
