২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে অর্থ পাচার ও সন্দেহজনক লেনদেন বেড়েছে ৭৮.৭৫%। বিএফআইইউর তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব ও রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে এই বিশ্লেষণে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে দেশের আর্থিক খাতে সন্দেহজনক লেনদেনের সংখ্যা ২৭ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। যা আগের পুরো অর্থবছরের তুলনায় ৭৮.৭৫ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই উল্লম্ফন শুধু পরিসংখ্যানগত নয়, বরং আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার জন্য একটি গভীর সংকেত।
একদিকে সন্দেহজনক লেনদেন বাড়ছে, অন্যদিকে সরকার ও বিএফআইইউ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিবছর হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ পরিবেশ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে।
ড. আহসান এইচ মনসুর স্পষ্টভাবেই বলেছেন, গত এক দশকে প্রায় ১৮-২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যা জিডিপির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
যদি একজন ব্যক্তি একাই বিদেশে ৩৫০টি বাড়ির মালিক হতে পারেন, তাহলে প্রশ্ন জাগে— এই লোপাট কি কেবল ব্যক্তিগত লোভ, নাকি কাঠামোগত ব্যর্থতা?
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পালাবদল এবং অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার পর বিএফআইইউর তৎপরতা অনেক বেড়েছে।
নতুন প্রশাসনের অধীনে ব্যাংক, বীমা, পুঁজিবাজার ও রেমিট্যান্স চ্যানেলগুলোতে নজরদারি বেড়েছে এবং রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এর ফলে রিপোর্টিংয়ের সংখ্যা বাড়লেও, প্রশ্ন থেকে যায়— এই রিপোর্টগুলি কি প্রকৃত অর্থ পাচার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখছে, নাকি শুধুই কাগজে-কলমে সংখ্যা?
প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, বিভিন্ন অনিয়মের ভিত্তিতে বিএফআইইউ প্রায় ১,২২০টি তথ্য বিভিন্ন সংস্থার কাছে হস্তান্তর করেছে। দুদক, সিআইডি, এনবিআর সহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা এই তথ্যগুলো পেয়ে থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে কয়টি মামলার চার্জশিট হয়েছে, কয়টি অর্থ উদ্ধার করা গেছে— তা স্পষ্ট নয়।
বিশ্বব্যাংকের এসটিএআর, ইউএসডোজ বা আইসিএআর-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তায় অর্থ ফেরত আনার উদ্যোগ আশা জাগায়, তবে এর বাস্তবায়ন হবে দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল।
অর্থ পাচার একটি দেশ থেকে কেবল অর্থই নয়, আস্থা ও সম্ভাবনাও চুরি করে নেয়। বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল হয়, টাকার অবমূল্যায়ন বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতি চাঙ্গা হয়। এতে অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর চাপ বাড়ে।
১. ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা: রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বোর্ডে রাজনৈতিক নিয়োগের পরিবর্তে দক্ষতা ভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
২. ডিজিটাল ট্রানজাকশনের সম্প্রসারণ: নগদ লেনদেনের সুযোগ কমিয়ে ডিজিটাল লেনদেন উৎসাহিত করতে হবে।
৩. আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে তদন্ত: শুধু দেশের অভ্যন্তরেই নয়, বিদেশে পাচারকৃত সম্পদের জন্যও বিশেষ ট্র্যাকিং ইউনিট গঠন জরুরি।
৪. ব্যবসায়িক পরিবেশ রক্ষা: যাঁরা প্রকৃত ব্যবসায়ী, তাঁদের হয়রানি না করে ‘রিয়েল টাইম রিস্ক প্রোফাইলিং’ চালু করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসে এটি একটি সংকটের সময়।
অর্থ পাচার ও সন্দেহজনক লেনদেন রোধে যে তৎপরতা শুরু হয়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু তা যেন জনমনে আস্থা ফেরানোর যোগ্য হয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং একটি টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো। না হলে সংখ্যার বাহার দেখিয়ে সমস্যার গভীরতা আড়াল করা যাবে না।
