আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির মাধ্যমে ১১ হাজারের বেশি রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে দলগুলোর তালিকা ও প্রমাণপত্রে ঘাটতির কারণে এই প্রক্রিয়া এখনও ধীরগতি।

রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের বিষয়টি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। নতুন করে আলোচনায় এসেছে বিষয়টি, যখন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানায় যে—এ পর্যন্ত ১১ হাজার ৪৪৮টি মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া শুরু হয় একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির মাধ্যমে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
সংখ্যায় বিশাল হলেও প্রশ্ন উঠছে এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।
কোন মাপকাঠিতে মামলা ‘রাজনৈতিক হয়রানি’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে? কমিটির সুপারিশের ভিত্তি কী? এবং এসব সুপারিশ কী হুট করেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নেয়া সিদ্ধান্ত নয় কি? এসব প্রশ্নে এখনও অন্ধকারে রয়েছে সাধারণ জনগণ ও সংশ্লিষ্ট মহল।
সরকার জানিয়েছে, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে যথাক্রমে ১৬ হাজার ও ১ হাজার ২০০টি মামলার তালিকা দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু উল্লেখযোগ্য যে, দলগুলো মামলার এজাহার ও চার্জশিট জমা দেয়নি—যা এই প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে।
এর ফলে প্রশ্ন উঠেছে: যদি এই মামলাগুলো প্রকৃতই হয়রানিমূলক হয়ে থাকে, তবে সেগুলোর প্রাথমিক তথ্য দিতে রাজনৈতিক দলগুলো এত অনাগ্রহী কেন? প্রক্রিয়ার প্রতি এ অবহেলা কি প্রমাণ করে না যে, ‘হয়রানিমূলক মামলা’র অনেকটাই রাজনৈতিক প্রচারণার অংশ?
অন্যদিকে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ মাত্র ৪৪টি মামলার তালিকা দিয়েছে, যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। তবে তারা মামলা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও দিয়েছে বলে জানা গেছে, যার ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
এখানে একটি নতুন বাস্তবতা সামনে আসে—কাগজপত্র সাপেক্ষে মামলা প্রত্যাহার প্রক্রিয়া অনেক বেশি কার্যকর। অথচ বড় রাজনৈতিক দলগুলো সেই দৃষ্টান্ত রাখতে পারছে না। এর ফলে পুরো প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা’ নামক ছাতার নিচে সব ধরনের মামলা ঢোকানো হলে তা ন্যায়বিচারের পরিপন্থী হতে পারে। তাই এ ধরনের মামলা প্রত্যাহারের আগে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ অপরিহার্য।
অন্যথায়, প্রকৃত অপরাধীরা রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে রেহাই পাবে এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও ক্ষুণ্ণ হবে।
বর্তমান প্রক্রিয়ায় শুধুই “সুপারিশ” হচ্ছে, কোনো প্রকাশযোগ্য প্রতিবেদন বা শুনানির ব্যবস্থা নেই। এই অবস্থা প্রক্রিয়াটিকে গোপনীয় ও রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হিসেবে চিহ্নিত করতে সাহায্য করছে।
কমিটির উচিত, প্রতি মাসের সুপারিশ ও প্রত্যাহারকৃত মামলার তথ্য পাবলিক ডোমেইনে প্রকাশ করা। এতে বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা ও সরকারের দায়বদ্ধতা—উভয়ই বাড়বে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মামলা একটি চিরকালীন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাই ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা’ প্রত্যাহারের উদ্যোগ সাধুবাদযোগ্য হলেও, এটি যেন আবার কোনো পক্ষের রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার না হয়।
চাই দল-মত-নির্বিশেষে স্বচ্ছ, তথ্যভিত্তিক এবং ন্যায়বিচারসম্মত প্রক্রিয়া।
এই প্রক্রিয়ায় সাংবাদিক সমাজ, মানবাধিকার সংস্থা, এবং বিচার বিভাগকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
না হলে ‘রাজনৈতিক হয়রানি’ ও ‘ন্যায়বিচার’ শব্দ দুটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রে কেবল শব্দ হয়ে থেকে যাবে।
