ভারত থেকে চাল আমদানির অনুরোধ জানালেও ইউনূস সরকারের ভারতবিরোধী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এখন কূটনৈতিকভাবে খাদ্য আমদানিতে চাপে পড়েছে। বিশ্লেষণ দেখুন।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে আবারও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সরকারি পর্যায়ে (G2G) ভারতে থেকে চাল আমদানির জন্য একাধিকবার অনুরোধ করলেও সাড়া মিলছে না নরেন্দ্র মোদির প্রশাসন থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে কেবল অর্থনৈতিক নয়, রয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্থিরতা। ভারতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী ‘ইউনূস সরকার’ এখনো একটি ‘বৈরিতাপূর্ণ প্রশাসন’ হিসেবে চিহ্নিত।
খাদ্য মন্ত্রণালয় জানায়, প্রথমবার জানুয়ারি এবং দ্বিতীয়বার ১৮ মে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হয়— সুলভ মূল্যে নন-বাসমতী সেদ্ধ চাল আমদানির জন্য একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের। কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। ভারত থেকে জবাবই আসেনি।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র বলছে, ভারতের নিরবতা কেবল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নয়, এটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর থেকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ক্রমেই শীতল হয়েছে। ইউনূস সরকারের ঘনিষ্ঠ মহল এনসিপি-জামায়াতের ভারতবিরোধী অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক মহলে ভারত-বিরোধী বক্তব্য তুলে ধরা—দিল্লিকে করেছে সন্দিহান।
স্বয়ং ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক বক্তৃতায় ভারতের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতকে ‘প্রতিপক্ষ’ বানানো তাদের কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আস্থাহীনতার সৃষ্টি করেছে।
এরই প্রতিক্রিয়ায় ৯ এপ্রিল ভারত পেট্রাপোল ও গেদে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশকে ‘থার্ড কান্ট্রি ট্রানজিট’ সুবিধা বাতিল করে। বাংলাদেশ ১৫ এপ্রিল প্রতিক্রিয়ায় ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ১৭ মে ভারত বাংলাদেশ থেকে ভোগ্যপণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়।
এই রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝেই খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে ভারতকে চিঠি দেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবে প্রতিক্রিয়া পায়নি।
২০২২ সালে বাংলাদেশ ছয়টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বার্ষিক কোটা চেয়েছিল ভারত সরকারের কাছে— চাল, গম, চিনি, পেঁয়াজ, রসুন ও আদা। ভারত মৌখিকভাবে সম্মতি দিলেও, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিষয়টি আর এগোয়নি।
অন্যদিকে, ভুটান ও মালদ্বীপকে ভারত নিয়মিত বার্ষিক কোটা সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে— বাংলাদেশের প্রতি ভারতের কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কি বদলে গেছে?
বাংলাদেশ ইতিমধ্যে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গে জিটুজি পদ্ধতিতে চাল আমদানির চুক্তি করেছে। কিন্তু এসব দেশের চাল পরিবহনে সময় ও খরচ বেশি। ভারত ছিল সবচেয়ে কাছের ও সহজ সরবরাহকারী।
উন্মুক্ত দরপত্র জটিল ও সময়সাপেক্ষ। অনেক সময় দরপত্রে অনুপযুক্ত সরবরাহকারী অংশ নেয়, যার ফলে গুণগত মান ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়। এমতাবস্থায় ভারতের মতো বড় উৎপাদনকারী দেশ থেকে জিটুজি মাধ্যমে চাল সংগ্রহ হলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হতো।
এই মুহূর্তে দেশে খাদ্য মজুদ ও সরকারি বিতরণ কার্যক্রম চালাতে আমদানি প্রয়োজন। কিন্তু রাজনৈতিক বৈরিতা ও কূটনৈতিক সংকটে পড়ে সাধারণ জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা আজ হুমকির মুখে। ভারতের সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক এবং অবকাঠামোগত ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নষ্ট হচ্ছে।
ড. ইউনূস ও তার সরকার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতবিরোধী বক্তব্য দিয়ে কূটনীতিতে আস্থা হারিয়েছে। আর তার প্রতিক্রিয়া পড়ছে খাদ্য আমদানির মতো মানবিক ও মৌলিক বিষয়ের ওপর।
বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা আজ কেবল অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জেও জর্জরিত। দেশের বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘বিচ্ছিন্ন’ অবস্থানে চলে যাওয়ায়, প্রতিবেশী শক্তিশালী বন্ধু ভারতের কাছ থেকে সহজাত সাহায্যও মিলছে না। রাজনৈতিক হঠকারিতা এবং কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির অভাব— ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদের বার্তা দিচ্ছে।
