ইশরাক হোসেনের ‘মেয়র আন্দোলনের’ ফলে ঢাকা দক্ষিণে নাগরিক সেবা অচল। আইন অমান্য করে মেয়রের ভূমিকা পালনে প্রশ্ন তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্লেষণ করলেন রাজনৈতিক অচলাবস্থা, প্রশাসনিক স্থবিরতা ও এর ভয়াবহ প্রভাব।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)-এর ভবনের প্রশাসনিক দায়িত্ব দখল করে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন যে ‘মেয়র আন্দোলন’ শুরু করেছেন, তা এখন নগর ব্যবস্থাপনায় গভীর সঙ্কটের জন্ম দিয়েছে। প্রায় ৩৫ দিন ধরে নগর ভবনের অচলাবস্থায় পড়েছেন এই এলাকার প্রায় সোয়া কোটি মানুষ। থেমে গেছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিধন কার্যক্রম, সড়কবাতি স্থাপন, ফুটপাত ও সড়ক সংস্কারসহ ২৮টি নাগরিক সেবা কার্যক্রম।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে—আইন না মেনে ইশরাক কীভাবে নিজেকে ‘নির্বাচিত মেয়র’ হিসেবে দাবি করছেন? কেন সরকারের পক্ষ থেকে এই দখলদারি ও প্রশাসনিক স্থবিরতায় দৃশ্যমান কোনো হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না?
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমদ স্পষ্ট করেই বলেছেন, ইশরাকের মেয়র হিসেবে শপথ নেওয়ার আর কোনো আইনগত সুযোগ নেই। কারণ, আদালতের নির্দেশনার মেয়াদ ২ জুনেই শেষ হয়ে গেছে। তদুপরি, সরকার কর্তৃক বাতিলকৃত নির্বাচনের ভিত্তিতে তিনি নিজেকে মেয়র দাবি করতে পারেন না।
এমনকি, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া একে “ফৌজদারি অপরাধ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, কারণ ইশরাক প্রশাসনিক ভবন দখল করে নাগরিক সেবা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছেন।
ভবন দখলের ফলে:
- হোল্ডিং ট্যাক্স জমা, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও ইস্যু বন্ধ।
- জন্ম ও ওয়ারিশ সনদ জটিলতায় নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও আইনি কাজ স্থবির।
- হাসপাতাল, মাতৃসেবা কেন্দ্র, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বন্ধ।
- ফুটপাত, রাস্তা, সড়কবাতি, নর্দমা সংস্কার বন্ধ।
সিদ্দিকবাজারের বাসিন্দা তাহেরা খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ওয়ারিশ সনদের জন্য এক মাস ধরে ঘুরছি। নগর ভবন বন্ধ থাকায় পরিবারে অশান্তি নেমে এসেছে।” আরেকজন নাগরিক জানান, “২৫ দিন ধরে জন্মসনদ না পাওয়ায় অসুস্থ শিশুর বিদেশগমন আটকে গেছে।”
বিস্ময়করভাবে, প্রশাসন কিংবা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি। সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন ভবনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কাজ চালাচ্ছেন—কেউ ক্রীড়া পরিষদ ভবনে, কেউ ওয়াসা কার্যালয়ে, কেউ পুড়ে যাওয়া সচিবালয়ের ভবনে। এমন বিশৃঙ্খলতা নগর ব্যবস্থাপনায় নজিরবিহীন।
সরকারের এই নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একজন নাগরিকের ভাষ্য—"সরকার যদি মনে করে ইশরাক ফৌজদারি অপরাধ করছেন, তাহলে তাঁকে গ্রেপ্তার করছে না কেন?"
ইশরাক হোসেনের দাবি, “সরকার আইন ভেঙে আমাকে শপথ নিতে দেয়নি। আমি অপরাধ করে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। বরং সরকারই নাগরিক সেবায় বাধা দিচ্ছে।”
তিনি মশক নিধন কর্মসূচিতে নিজে অংশ নিয়ে ‘ছায়া মেয়র’ হিসেবে জনগণের দৃষ্টিতে কার্যকর অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন।
তবে স্থানীয় সরকার বিশ্লেষক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, “যে নির্বাচনই ছিল অবৈধ, সেই নির্বাচনের প্রেক্ষিতে তিনি কীভাবে মেয়র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন?”
ইশরাকের পদক্ষেপ রাজনৈতিক কৌশল, নাকি প্রশাসনিক জুয়া? প্রশ্ন উঠছে—তিনি কি সরকারি ব্যর্থতা কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করছেন, নাকি অনিয়ম করে পুরো নগর ব্যবস্থাকে জিম্মি করছেন?
নাগরিক সেবা বন্ধ করে, ভবন দখল করে, যদি একজন ব্যক্তি প্রশাসনিক দায়িত্ব নিতে পারেন, তাহলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ন্যূনতম নিয়ম কোথায়? এই পরিস্থিতি কেবল নগরের জন্য নয়, বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর জন্যও একটি বিপজ্জনক নজির হতে পারে।
সরকারের উচিত অবিলম্বে আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে এই স্থবিরতা নিরসন করা। নাগরিক সেবা রাজনৈতিক কৌশলের বলি হতে পারে না। একইসঙ্গে, কোনো রাজনৈতিক নেতারও অধিকার নেই, আইনের তোয়াক্কা না করে নিজেকে ‘ছায়া মেয়র’ ঘোষণা করে পুরো নগরবাসীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলার।
