ভোলা সরকারি কলেজের ছাত্রদল নেত্রী ইপ্সিতার মরদেহ পাওয়া গেছে মেঘনায়। গণধর্ষণের পর নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ। ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা।
২১ বছর বয়সী এক তরুণী, যার নাম সুকর্না আক্তার ইপ্সিতা—ভোলা সরকারি কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী। এখন তার নাম সংবাদ শিরোনামে, কিন্তু একটি লাশ হিসেবে—মেঘনা নদীতে ভেসে ওঠা এক ‘বেওয়ারিশ’ দেহ।
ঘটনাটি চরম অনিশ্চয়তা, রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিহিংসার এক জ্বলন্ত চিত্র।
১৩ জুন, ইপ্সিতা কর্ণফুলী-৪ লঞ্চে করে ঢাকা উদ্দেশে রওনা দেন। এরপর থেকেই নিখোঁজ। পরিবার ও বন্ধুবান্ধব বহু খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে চারদিন পর তার মরদেহ পাওয়া যায় লক্ষ্মীপুর সংলগ্ন মেঘনা নদীতে। পুলিশের পক্ষ থেকে মরদেহটি “অজ্ঞাতপরিচয় বেওয়ারিশ” হিসেবে দাফন করা হয়।
পরিবার সংবাদমাধ্যমে ছবি দেখে শনাক্ত করে—এটি ইপ্সিতার লাশ। এখানেই শুরু হয় প্রশ্নচিহ্নের ঝড়।
ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আলম গণমাধ্যমকে জানান,
“মেয়েটিকে লঞ্চে গণধর্ষণ করা হয়েছিল। সে প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দেয়।”
এই বক্তব্য যদি আংশিক সত্যও হয়, তাহলে সেটি প্রমাণ করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভয়াবহ ব্যর্থতা এবং নারীর জন্য গণপরিবহন কতটা অনিরাপদ।
কিন্তু এখানেই প্রশ্ন শেষ হয় না—
ঘটনার আরেকটি মাত্রা যুক্ত হয় যখন জানা যায়, ইপ্সিতা ১৩ জুন এক ফেসবুক পোস্টে “ছাত্রদলের কর্মীদের হুমকি” এবং “রাজনীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা” দিয়েছিলেন। তার কয়েক দিনের মধ্যেই তার লাশ পাওয়া গেল।
এমন ‘সময়মতো’ ঘটনা কি নিছক কাকতালীয়, না কি কোনো সংগঠিত পরিকল্পনার অংশ?
তার সহপাঠীরা বলছে—
“আমরা ভয় পাচ্ছি, এটা কেবল একটা দুর্ঘটনা ছিল না। হয়তো পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। হয়তো সে ছিল সেই কণ্ঠ, যাকে চুপ করিয়ে দেওয়া দরকার ছিল!”
এ বক্তব্য এক ভীতিকর বাস্তবতা সামনে আনে—বাংলাদেশে রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলে নারীর জীবনও নিরাপদ নয়।
এত বড় একটি ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি। পুলিশের পক্ষ থেকেও মামলা নেয়া হয়নি, কাউকে আটক করা হয়নি। লাশ দাফনের আগে শনাক্ত করতে কেন কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি, সে প্রশ্নও ওঠে।
এটি কি অনিচ্ছাকৃত অবহেলা, না কি সচেতন গা-ছাড়া মনোভাব?
ইপ্সিতার ঘটনা একদিকে নারীর নিরাপত্তাহীনতার চরম উদাহরণ, অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বহীনতার আয়না। একইসঙ্গে এটি একটি গভীর রাজনৈতিক সংকেত—ভিন্নমতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধের জন্য নারীকেও নিশানা করা হচ্ছে।
এই সমাজে নারীর রাজনীতি কি এখনও অপরাধ?
না কি গণতন্ত্রের নামে নারীর সম্ভ্রম আজও বলি হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের রোষে?
ইপ্সিতার মৃত্যু নিছক এক ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি রাজনৈতিক সহিংসতা, নারীর অধিকার, বিচারহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার এক গ্লানিকর প্রতিচ্ছবি। যদি তার পরিবার, ছাত্রদল ও সহপাঠীদের অভিযোগ সত্য হয়, তবে এটি একটি হত্যাকাণ্ড। আর যদি প্রশাসনের নিস্ক্রিয়তাই সত্য হয়, তবে তা সমান অপরাধ।
ছাত্রদল ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—
এবার কি ন্যায়বিচার হবে, নাকি আরও একবার একটি নাম হারিয়ে যাবে নদীর স্রোতে, ইতিহাসের গলিঘুপচিতে?
