বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে মুখপাত্র উমামা ফাতেমার পদত্যাগ ঘিরে সংগঠনটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, সুবিধাবাদ, এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের চিত্র উঠে এসেছে। তার বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন—এ এক সময়কার আলোচিত প্ল্যাটফর্ম। ছাত্ররাজনীতির এক ভিন্ন পথের সন্ধান দিয়েছিল এই ব্যানার। কিন্তু শুক্রবার রাতে উমামা ফাতেমার এক দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট যেন সেই আশা-আকাঙ্ক্ষার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে।
উমামা ফাতেমা—উত্তাল জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির সমন্বয়ক ও সংগঠনের সাবেক মুখপাত্র। তাঁর বিদায়ের ভাষ্য শুধু একটি ব্যক্তিগত পদত্যাগপত্র নয়, বরং এটি একটি ছিন্নভিন্ন ছাত্র রাজনীতির অন্তঃসারশূন্য বাস্তবতার প্রকাশ।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে যে ছাত্র অভ্যুত্থান রাষ্ট্র ও সমাজে পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছিল, সেই উত্তাপেই জন্ম নিয়েছিল "বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন"। এনসিপি নামক রাজনৈতিক দলের বিকল্প হিসেবে এটি যাত্রা শুরু করেছিল একটি উদার, স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। কিন্তু সময়ের প্রবাহে এটি হয়ে উঠেছে সুবিধাবাদীদের অভয়ারণ্য, রাজনীতিকদের প্রেসক্রিপশন শো রুম।
উমামার ভাষায়—এই আন্দোলন এখন “বদ্ধ জলাশয়ে আটকে পড়া ভাই-ব্রাদার রাজনীতির বলয়”।
নতুন কাউন্সিল ঘোষণার পর উমামা ফাতেমা ফেসবুকে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতে উঠে এসেছে কয়েকটি গুরত্বপূর্ণ অভিযোগ:
সাংগঠনিক প্রেসক্রিপশন: নেতৃত্বের ওপর রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ভয়াবহ হস্তক্ষেপ ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
স্মিয়ার ক্যাম্পেইন ও চরিত্র হনন: মুখপাত্র হয়েও তাঁর নামে প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব পেইজ থেকেই পোস্ট করা হয়েছে, যা ইঙ্গিত করে এক গভীর অন্তর্ঘাতমূলক কৌশল।
কমিটি গঠনের অনিয়ম: জেলা ও উপজেলা কমিটি গঠনে দায়িত্বপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্ব ও অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অভিযোগ উঠেছে।
গণতান্ত্রিক চর্চার অভাব: কাউন্সিল নির্বাচনে প্রার্থিতা ও ভোটাধিকার ছিল সীমিত এবং অগণতান্ত্রিক।রাজনৈতিক
বার্গেইনিং: নেতৃত্ব ও পদ পাওয়ার লোভে অনেকে “হেয়ার রোড” মুখাপেক্ষী ছিলেন বলে অভিযোগ।
যে উমামা ফাতেমা ছাত্র রাজনীতির একটি নৈতিক বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছিলেন, তিনি তার বিবৃতিতে প্রকাশ করেন এক অসহনীয় মানসিক বিপর্যয়ের কথা। প্রোপাগান্ডা, হেয়মন্তব্য, বার্গেইনিং—সব মিলিয়ে তিনি অনুভব করেন যে তাঁর পায়ের নিচে জমি নেই।
তাঁর বক্তব্যে সবচেয়ে বেদনাবিধুর অংশ হলো—
“অভ্যুত্থান যেমন স্বপ্ন দেখিয়েছে, গোষ্ঠীস্বার্থে এই প্ল্যাটফর্ম একইভাবে বহু মানুষের স্বপ্ন ও সময় নষ্ট করেছে।”
উমামা কাউন্সিলে ভোট দিয়ে শেষ মুহূর্তে কিছু ভালো কিছুর আশায় ছিলেন। কিন্তু রাতারাতি যেভাবে নেতৃত্বের পছন্দ বদল হয়, তাতে তিনি নির্বাচন ও প্ল্যাটফর্ম উভয় থেকেই ভোট প্রত্যাহার করেছেন।
তিনি বলেন—
“আমি রুহের ভেতর থেকে বদদোয়া দিচ্ছি এই মোনাফেকদের।”
এই শব্দচয়ন এক রাজনৈতিক হতাশা নয়, এটি একজন নিঃস্ব হতে বসা আদর্শবাদীর চিৎকার।
সবশেষে তিনি ছাত্রদের পরামর্শ দেন রাজনীতির বিষাক্ত বলয় থেকে দূরে সরে এসে নিজেদের ব্যক্তিগত বিকাশে মনোযোগ দিতে। পরামর্শ দেন—
“পড়ার টেবিলে মনোযোগ দিন, কাজে মনোযোগ দিন।”
উমামা ফাতেমার এই পদত্যাগপত্র শুধুই একটি প্রতিবাদ নয়, এটি এক প্রজন্মের রাজনৈতিক বিকল্পচিন্তার ব্যর্থতার দলিল। এটি স্পষ্ট করে দেয়, আদর্শিক ছাত্ররাজনীতিকে যদি রাজনৈতিক লেজুড়তন্ত্র গ্রাস করে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে আর কোনো নৈতিক ব্যানার থাকবে না।
