ডেমরায় রাস্তার পাশে হাত বাঁধা ও গলায় কাপড় পেঁচানো অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের মরদেহ উদ্ধার ঘিরে রহস্য দানা বাঁধছে। এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড নাকি কোনো চক্রের বার্তা? বিশ্লেষণ করছে আমাদের বিশেষ প্রতিবেদন।
রাজধানীর ডেমরা এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ড যেন নতুন করে প্রশ্ন তুলছে—ঢাকার উপশহরগুলো কতটা নিরাপদ? আমুলিয়া মডেল টাউনের চায়না বিদ্যুৎ প্রজেক্ট সংলগ্ন রাস্তার পাশে হাত বাঁধা ও গলায় কাপড় পেঁচানো অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের (২৬) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ প্রবণতা এবং হত্যাকাণ্ডের ধরণ—সব কিছুই নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে।
ডেমরা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) দীপঙ্কর কুমার দেবনাথ জানিয়েছেন, রোববার রাতে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
হাত পিঠমোড়া করে বাঁধা এবং গলায় কাপড় পেঁচানো ছিল, যা দেখে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে—শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ ফেলে যাওয়া হয়েছে।
নিহতের পরনে ছিল কালো ফুলহাতা গেঞ্জি ও জলপাই রংয়ের ট্রাউজার।
হত্যার ধরন, স্থান এবং সময় বিশ্লেষণ করলে এটিকে তাৎক্ষণিক রাগের বহিঃপ্রকাশ মনে হয় না। বরং, পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের লক্ষণ স্পষ্ট।
হাত বেঁধে হত্যা এবং রাস্তার পাশে মরদেহ ফেলে যাওয়া একটি বার্তা বহন করে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সিআইডি ক্রাইমসিন ইউনিট ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে, তবে এখনো নিহতের পরিচয় জানা যায়নি।
গত কয়েক বছরে রাজধানী ঢাকায় গ্যাং-সংস্কৃতি, মাদকচক্র এবং আদায়-চাঁদাবাজি চক্রের আধিপত্য বিস্তার লক্ষ্য করা গেছে।
এমনকি ক্ষমতাসীন দলের কিছু প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় অনেক যুবক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই হত্যা কি সেই অপরাধ-রাজনীতিরই একটি উপসর্গ?
বাংলাদেশ পুলিশের ২০২৪ সালের অপরাধ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরে শুধুমাত্র ‘অজ্ঞাত পরিচয়’ হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ১৮৭টি।
যার মধ্যে ৬০ শতাংশই আজ পর্যন্ত অমীমাংসিত। এর একটি বড় অংশ ছিল রাস্তার পাশে কিংবা পরিত্যক্ত ভবনে ফেলে রাখা মরদেহ।
আমুলিয়া মডেল টাউন এলাকায় এই ধরনের হত্যাকাণ্ড নতুন নয়। ২০২৩ সালেও একই স্থানে একটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছিল। ফলে স্থানীয়রা আতঙ্কিত এবং পুলিশের কার্যকর তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। এই হত্যাকাণ্ডে এলাকাবাসীর কাছে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী নেই—এটি আরও সন্দেহজনক।
এমন ঘটনায় দোষীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের হার অত্যন্ত কম। তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, আলামতের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিচারপ্রক্রিয়াকে ধীরগতির করে তুলছে।
অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, যদি নিহত যুবকের পরিচয় শনাক্ত না করা যায়, তাহলে ঘটনাটি ধামাচাপা পড়ে যাওয়ার শঙ্কাই বেশি।
ডেমরার এই হাত বাঁধা যুবকের হত্যাকাণ্ড শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি আমাদের সমাজে বিদ্যমান নিরাপত্তা সংকট, অপরাধের বেপরোয়া বিস্তার এবং বিচারহীনতার কালো প্রতিচ্ছবি।
পুলিশের তদন্তে যদি এটি পরিকল্পিত খুন প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি কেবল ব্যক্তি হত্যার ঘটনা নয়—বরং এক সামাজিক বার্তা, যা অপরাধীরা নির্ভয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
সেই প্রশ্নটাই বারবার ঘুরে ফিরে আসছে—ঢাকার রাস্তায় কি এখন মরদেহ ফেলে যাওয়াও ‘নতুন স্বাভাবিক’ হয়ে উঠছে?
