কিশোরগঞ্জে এনসিপি নেতা রাজিন সালেহর বিরুদ্ধে স্ত্রীকে তালাক দিয়ে শিশুকন্যাকে কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যৌতুক, নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ইঙ্গিতে ঘটনার গভীরে অনুসন্ধান এই প্রতিবেদনে।
স্থানীয় রাজনীতি, পারিবারিক সহিংসতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার জটিল সমীকরণ আবারও আলোচনায় এসেছে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থেকে উঠে আসা এক অভিযোগে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) উপজেলার প্রধান সমন্বয়ক রাজিন সালেহর বিরুদ্ধে তাঁর স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার হাসি যে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন, তা শুধু পারিবারিক কলহ নয়—একটি রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থারও প্রতিচ্ছবি।
সংবাদ সম্মেলনে সুমাইয়া যে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন, তা ভয়াবহ ও করুণ এক চিত্র তুলে ধরে—যেখানে একজন নারী বারবার নির্যাতনের শিকার হয়েও আড়াই বছরের শিশুকন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছেন।
যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, স্বর্ণালংকার বিক্রির অভিযোগ, বারবার বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া—সবই আমাদের সমাজের বহু পরিচিত অথচ উপেক্ষিত এক বাস্তবতা।
বিবাহিত জীবনের এমন চরম পর্যায়ে এসে যখন এক নারী সন্তানকে কোলে নিয়েও নিরাপদ থাকতে পারেন না, তখন তা নিছক ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি এক সামাজিক সংকট।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো-
অভিযোগের পর রাজিনের বিরুদ্ধে যখন পাকুন্দিয়া ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়।
তখন এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা সানী আহম্মেদ ফোনে অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেন—যা প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারেরই ইঙ্গিত দেয়।
রাজনীতির প্রভাব শুধু অভিযোগ নিষ্পত্তিকে বিলম্বিত করে না, এটি ভুক্তভোগী নারীর সাহসকেও ক্ষুণ্ণ করে।
আরও উদ্বেগজনক হলো শিশু কন্যার হেফাজতের ইস্যু।
সুমাইয়ার অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ জুলাই বিকেলে মেয়েকে ‘ফিরিয়ে দেবেন’ বলে নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি রাজিন।
পরবর্তীতে ইউএনও অফিসে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, ২৭ জুন আদালতের মাধ্যমে তালাক দেওয়া হয়েছে।
অথচ তালাকের কোনো পূর্বানুমতি বা বিজ্ঞপ্তি তাঁকে জানানো হয়নি বলে দাবি সুমাইয়ার।
অভিযোগ অনুযায়ী, এটি যদি সত্য হয় তবে এটি শুধু পারিবারিক নয়—আইন ও শিশুর অধিকারের পরিপন্থী একটি স্পষ্ট উদাহরণ।
রাজিন সালেহ যে যুক্তি দিচ্ছেন—“শিশুকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল, তাই নিজের কাছে রেখেছি”—তা কার্যত একটি একতরফা সিদ্ধান্ত;
আদালতের অনুমোদন ছাড়া শিশুকে মায়ের কাছ থেকে সরিয়ে রাখা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
রাজিনের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি ‘রাষ্ট্রীয় বিধিমোতাবেক’ তালাক দিয়েছেন এবং কাবিনের পুরো অর্থ পরিশোধ করেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, তালাকের কাগজ পাঠানো হলেই কি তা কার্যকর হয় যদি স্ত্রী তা গ্রহণ না করেন বা জানতে না পারেন?
বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইনে তালাক কার্যকর হতে হলে সংশ্লিষ্ট স্ত্রীকে লিখিতভাবে জানানো ও তালাক বোর্ডে নথিভুক্তি আবশ্যক। এখানে তালাক প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নোটিফিকেশনের ঘাটতি থাকলে তা আইনি জটিলতা ডেকে আনতে পারে।
রাজিন সালেহ অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়কে এনসিপি’র ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে প্রশ্ন হলো, যখন কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ আসে, তখন দলীয় অবস্থান কী হওয়া উচিত?
দলের ভাবমূর্তি রক্ষার চেয়ে ন্যায়বিচার ও নারী-শিশুর অধিকার রক্ষার অবস্থান গ্রহণই হতে পারে রাজনৈতিক নৈতিকতার পরীক্ষা।
পাকুন্দিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বিল্লাল হোসেন যে মন্তব্য করেছেন—“শিশুর ভবিষ্যৎ বিবেচনায় ন্যায়বিচারই কাম্য”—তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু নোটিশ গ্রহণ নয়, সন্তান হেফাজতের বিষয়টি দ্রুত আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি, নারী নির্যাতনের অভিযোগের তদন্ত এবং ভুক্তভোগী নারীর আইনি সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
রাজনীতির ছত্রছায়ায় থাকা কোনো ব্যক্তির দ্বারা পরিবারের একজন সদস্য যদি নির্যাতিত হন।
তাহলে বিষয়টি নিছক পারিবারিক কলহ নয়—তা হয়ে ওঠে সমাজে শক্তির অপব্যবহার ও বিচারহীনতার প্রতিচ্ছবি।
নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, আইনের সমতা এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন এখন এ ঘটনায় জড়িয়ে গেছে।
এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হতে পারে।
বাংলাদেশে আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমে নয়, বাস্তবেও কার্যকর।
