মাত্র এক বছরে বিএনপির আয় বেড়েছে প্রায় ১৪ গুণ, যেখানে ২০২৩ সালে আয় ছিল ১.১০ কোটি, ২০২৪ সালে তা দাঁড়ায় ১৫.৬৫ কোটি টাকায়। কীভাবে এই আয় এলো, কোথায় ব্যয় হলো—তার বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে এই কলামে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে অর্থের প্রবাহের দিকটি প্রায়শই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। তবে রাজনৈতিক দলের অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও চিত্র বোঝার অন্যতম সুযোগ হলো নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব। ঠিক সেখানেই চমকে দেওয়ার মতো এক চিত্র হাজির করেছে বিএনপি। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে দলটির আয় বেড়েছে প্রায় ১৪ গুণ—যা অর্থনীতিবিদ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।
| অর্থবছর | মোট আয় (টাকা) | মোট ব্যয় (টাকা) | উদ্বৃত্ত (টাকা) |
|---|---|---|---|
| ২০২৩ | ১,১০,৮০,১৫১ | ৩,৬৫,২৩,৯৭০ | -২,৫৪,৪৩,৮১৯ |
| ২০২৪ | ১৫,৬৫,৯৪,৮৪২ | ৪,৮০,০৪,৮২৩ | ১০,৮৫,৯০,০১৯ |
বিএনপির পক্ষ থেকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, ২০২৪ সালে দলের আয়ের মূল উৎস ছিল—
- জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মাসিক চাঁদা
- দলীয় বইপুস্তক বিক্রয়
- বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদান
- ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ থেকে পাওয়া সুদ
এই বিবরণ অনুযায়ী, অধিকাংশ অর্থ এসেছে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং কিছু অনুদানভিত্তিক।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই অর্থের ট্রান্সপারেন্সি বা স্বচ্ছতা কতটুকু নিশ্চিত করা হয়েছে?
অনুদানদাতাদের পরিচয় কি প্রকাশযোগ্য, নাকি গোপনীয়?
২০২৪ সালে ব্যয় কমেছে আগের বছরের তুলনায়। তবে ব্যয়ের খাতগুলো রাজনৈতিক কার্যক্রম ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে। যেমন:
- আর্থিক সহায়তা প্রদান
- বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ
- প্রচার সামগ্রী ছাপানো (পোস্টার-লিফলেট)
- সভা ও অনুষ্ঠান আয়োজন
- ইফতার মাহফিলের আয়োজন
- দাপ্তরিক ক্রয়
একটি রাজনৈতিক দলের জন্য এসব ব্যয় স্বাভাবিক হলেও ব্যয়ের বিপরীতে উদ্বৃত্ত ১০ কোটির বেশি থাকাও কম বিস্ময়ের নয়।
এই বিস্ময়কর আয়-বৃদ্ধি কেবল হিসাবের খাতায় একটি সংখ্যা নয়, বরং রাজনীতির ভিতরে এক নতুন প্রশ্নও বয়ে এনেছে— রাজনৈতিক অর্থায়নে কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা বা নতুন পৃষ্ঠপোষকতা কি যুক্ত হয়েছে?
নাকি এটি দলের অভ্যন্তরীণ সংগঠন পুনর্জাগরণের ফল?
তাছাড়া, বিএনপি যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে এবং দলীয় কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে সীমিত—তখন এত বিশাল অর্থ সংগ্রহ দলের ভিতরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, সেটিও ভাবনার বিষয়।
নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আগের বছরের হিসাব জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক।
বিএনপি সেই নিয়ম মেনেই হিসাব জমা দিয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব কতটুকু এই আয়ের উৎস যাচাই করতে পারে, বা করতে চায়, সেটিও জরুরি প্রশ্ন।
কারণ, রাজনীতিতে অর্থের প্রবাহ যদি অস্বচ্ছ থাকে, তাহলে তাতে নির্বাচনব্যবস্থা এবং গণতন্ত্র—উভয়ই ঝুঁকিতে পড়ে।
মাত্র এক বছরে বিএনপির ১৪ গুণ আয়বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে আলোচনার যোগ্য।
এটি হয়তো রাজনৈতিক সংগঠনের আর্থিক পুনরুজ্জীবনের ইঙ্গিত, আবার কারও কাছে এটি অস্বচ্ছতার বা গোপন পৃষ্ঠপোষকতার ইঙ্গিতও হতে পারে।
রাজনীতিতে অর্থের স্বচ্ছতা ও উৎসের জবাবদিহিতা—এই দুটি বিষয়ই যদি উপেক্ষিত হয়, তাহলে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
বিএনপির এই আয়ের ব্যাখ্যা রাজনৈতিক ভাষায় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাংবাদিকতা ও বিশ্লেষণের জন্যও এটি এক উন্মুক্ত প্রশ্ন।
