বর্ষীয়ান অভিনেতা ও মুক্তিযোদ্ধা সোহেল রানার ফেসবুক পোস্ট ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—এই দেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধারও যদি সম্মান না থাকে, তাহলে সাধারণ নাগরিকের পরিণতি কী?
মুক্তিযুদ্ধ শুধুই ইতিহাস নয়, জাতিসত্তার ভিত্তি। কিন্তু সেই ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষ্য—মুক্তিযোদ্ধা সনদ—যখন অবহেলার প্রতীক হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু এক ব্যক্তির নয়, বরং গোটা জাতির ব্যর্থতার দলিল। সম্প্রতি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা, নির্মাতা ও গর্বিত মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা তার ফেসবুকে দেওয়া কিছু পোস্টে এই অবমাননার গভীর ক্ষত প্রকাশ করেছেন।
১৯৭১ সালে যিনি অস্ত্র হাতে নিয়ে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন, ‘ওরা ১১ জন’-এর মতো ঐতিহাসিক সিনেমার প্রযোজনা করেছেন, আজ তাকেই দুজনের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে হাসপাতালের লাইনে।
তার বক্তব্যে উঠে এসেছে চিকিৎসা খাতে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মানহীনতা, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং রাষ্ট্রীয় অবজ্ঞা।
“২৫ জনের বসার জায়গায় ১০০ জন রোগী দাঁড়িয়ে। জাতীয় পরিচয়পত্র বা মুক্তিযোদ্ধা আইডি কিছুই কাজ করে না।”
— ফেসবুক পোস্ট, সোহেল রানা
তার একেকটি পোস্ট যেন একটি সমাজতাত্ত্বিক প্রতিবেদন।
“ধিক তোমাকে, ধিক তোমার মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট ও মুক্তিযোদ্ধা আইডেনটিটি কার্ডকে।”
— মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা
যেখানে একজন মুক্তিযোদ্ধা শুধুমাত্র একটি ভালো চিকিৎসা পাওয়ার জন্য ধিক্কার দিচ্ছেন সেই সনদকে, যা একদিন গর্বের প্রতীক ছিল।
এটি একটি সামগ্রিক প্রশ্ন তোলে—এই রাষ্ট্র কি তার নায়কদের আর চেনে না?
প্রতিটি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের এক প্রজন্ম—যারা অস্ত্র হাতে মুক্তির যুদ্ধ করেছিল—আজ সেই রাষ্ট্রের হাসপাতালের বারান্দায় অবহেলিত।
এমনকি সিনেমা, নাটক ও বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের বীরদের যতটা স্মরণ করা হয়, বাস্তবজীবনে তাদের অবস্থান তার উল্টো।
সোহেল রানার পোস্টগুলো সামাজিক মাধ্যমে তীব্র আলোড়ন তুলেছে।
হাজারো মন্তব্যে মানুষ জানিয়েছেন, একজন সোহেল রানা যদি অবহেলিত হন, তাহলে একজন গড়পড়তা মুক্তিযোদ্ধার বা সাধারণ প্রবীণ নাগরিকের কী অবস্থা হতে পারে! অনেকেই এই ঘটনাকে রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
সোহেল রানার এই পোস্ট শুধুই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এটি এক জাতির আত্মসমালোচনার সুযোগ।
আমরা কি স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা ও জাতীয় সংগীত বুঝি?
নাকি আমরা ভুলে গেছি সেই রক্তাক্ত ইতিহাস, যে ইতিহাস আজ সনদে বন্দী হয়ে অবহেলিত?
যে রাষ্ট্র তার মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দিতে পারে না, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যতের নাগরিকদেরও নিরাপত্তা দিতে পারবে না।
সুতরাং, এই ঘটনার প্রতিফলন হওয়া উচিত নীতিনির্ধারকদের কাজ ও চিন্তায়।
সম্মান শুধু পুরস্কার বা ভাতা দিয়ে হয় না—সেটা প্রতিষ্ঠা করতে হয় ব্যবস্থা ও আচরণে।
