২০০৭-০৮ সালে তৈরি মার্কিন ‘সাই-অপস’ নীল নকশা ২০০৯ সালে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা হয়েছিল। ভারত তা ঠেকালেও ২০২৪-এ সেই ষড়যন্ত্র নতুন রূপে ফিরে এসেছে। ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা বোঝার জন্য কেবল গত ১৫ বছরের ঘটনাপ্রবাহে তাকালে চলবে না—এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক খেলার অংশ, যার সূত্রপাত ২০০১-২০০৮ সময়কালে। সেই সময় বিএনপি-জামাত জোট, সেনাবাহিনীর একাংশ, পাকিস্তানি আইএসআই এবং মার্কিন সিআইএ এক হয়ে এমন একটি পরিকল্পনা আঁটে, যার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো ভেঙে ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ কায়েম করা।
মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা Psychological Operations (Psy-Ops) প্রথমে একাডেমিক গবেষণার বিষয় ছিল, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইহুদি বুদ্ধিজীবীরা নাৎসি আগ্রাসনের মোকাবেলায় উদ্ভাবন করেছিলেন।
কিন্তু পরিহাসের বিষয়, জার্মান গেস্টাপো সেই কৌশলকে উল্টো ইহুদিদের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার গোপন সংস্থা OSS এবং পরবর্তীতে CIA এই কৌশল নিজেদের হাতে নেয়।
লক্ষ্য ছিল সরাসরি যুদ্ধ না করে দেশ দখল—এমন এক অপ্রচলিত যুদ্ধ যেখানে গোলাগুলির বদলে অস্ত্র হয়ে ওঠে মিথ্যা তথ্য, বিভ্রান্তি, ভয় এবং নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া।
এটি ভিয়েতনাম, চিলি, ইরান, গুয়াতেমালা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ইউক্রেন ও আরব বসন্তে বারবার প্রয়োগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে এই কৌশল পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ শুরু হয় ২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়।
লক্ষ্য ছিল ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর একটি ‘নরম অভ্যুত্থান’ ঘটানো।
পরিকল্পনাটি ছিল ‘জাকার্তা মেথড’-এর আদলে—যেখানে প্রথমে সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে বিভাজন তৈরি, এরপর একটি নিয়ন্ত্রিত বিদ্রোহ ঘটিয়ে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা।
এরই অংশ হিসেবে ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহ ঘটে, যেখানে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নৃশংসভাবে নিহত হন।
এই ঘটনা শুধু বিদ্রোহ ছিল না—এটি ছিল গোয়েন্দা-পরিকল্পিত একটি ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’, যার লক্ষ্য ছিল সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামো ধ্বংস করা।
কিন্তু ভারত সেই সময় সরাসরি সেনা অনুপ্রবেশের হুমকি দিয়ে পরিকল্পনাটি ভেস্তে দেয়।
পরিকল্পনায় ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন নকশাকারীরা দীর্ঘমেয়াদি ‘গোয়েবলসীয়’ পদ্ধতি গ্রহণ করে।
বিগত ১৫ বছরে তারা—
সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানিপুলেশন: গুজব, অপপ্রচার, অর্ধসত্য খবর ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা।
প্রক্সি লিডার তৈরী: নোবেল শান্তি পুরস্কারধারী মুখোশধারী নেতা, ছাত্র আন্দোলনের হিরো বা ধর্মীয় উগ্রবাদী ব্যক্তিত্বকে ‘গণতন্ত্রের রক্ষক’ রূপে প্রচার।
ধর্মীয় ও জাতিগত বিভাজন উসকে দেওয়া: হেফাজত, হিজবুত তাহরীর বা তথাকথিত নাগরিক কমিটির মাধ্যমে মাটির নিচে বিভাজন সৃষ্টি।
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ: নির্দিষ্ট মিডিয়া ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে আর্থিকভাবে সহায়তা করে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণা চালানো।
২০২৪ সালের অস্থিরতা আসলে ২০০৯ সালের ব্যর্থ পরিকল্পনার বিলম্বিত সংস্করণ।
বিগত ১৫ বছরে যারা সরকারবিরোধী প্রচারণায় যুক্ত থেকেছেন, অথচ রাষ্ট্রবিরোধী কোনো দলের সদস্য নন, তারাও অজান্তেই এই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ‘পেয়াদা’ হয়ে গেছেন।
একই কৌশল দেখা গেছে—
চিলি (১৯৭৩): সালভাদর আয়েন্দেকে উৎখাত করে মার্কিন সমর্থিত পিনোশের ক্ষমতায় আসা।
ইরান (১৯৫৩): মোসাদ্দেককে উৎখাত করে শাহ’কে বসানো।
আরব বসন্ত (২০১০): মিসর, লিবিয়া, সিরিয়ায় ‘গণতন্ত্র আন্দোলন’ নামে অভ্যন্তরীণ ধ্বংসযজ্ঞ।
বাংলাদেশও আজ একই কৌশলের শিকার।
পার্থক্য শুধু সময় ও প্রেক্ষাপটে—এবার যুদ্ধক্ষেত্র অনলাইনে এবং লক্ষ্য জনগণের মানসিক অবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা।
আমরা যদি এখনই মার্কিন সাই-অপসের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে না তুলি, তবে বাংলাদেশ ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানের পরিণতি থেকে রক্ষা পাবে না।
এই দায় কেবল আওয়ামী লীগের নয়—রাষ্ট্রবিরোধী প্রচারণার বাহক হিসেবে যারা কাজ করেছেন, তাদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।
এখনও সময় শেষ হয়নি।
প্রতিরোধের সময় এখনই।
