কিশোরগঞ্জের সমাবেশে মুফতি ফয়জুল করীম বিএনপিকে ‘লুটপাটের রাজত্ব’ কায়েমের অভিযোগে স্ক্যান্ডাল করেন। সারজিস ইস্যু, পিআর পদ্ধতির দাবি ও বিএনপির দ্বিমুখী রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে বিশ্লেষণ।
কিশোরগঞ্জের আজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের গণসমাবেশে সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের বক্তব্য বিএনপির জন্য শুধু সমালোচনা নয়, বরং এক ধরনের রাজনৈতিক ‘আয়না’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন—বিএনপি আজ সারা দেশে চাঁদাবাজি, লুটপাট ও ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যেখানে দুর্নীতিবাজদের পুরস্কৃত করা হয় আর গ্রেপ্তার শুধুমাত্র প্রতিপক্ষের জন্য সংরক্ষিত।
মুফতি ফয়জুল করীমের বক্তৃতার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল সারজিস আলম ইস্যু।
তার অভিযোগ—
বিএনপি সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই মামলা করেছে, যিনি একসময় বিএনপির নেতাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিলেন।
ইতিহাস বলে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকলেও বাংলাদেশে অনেক সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সহায়তার মুহূর্তগুলি অস্বীকার করা হয়নি।
কিন্তু বিএনপির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র—
যাদের কারণে তারেক রহমান বিদেশে নিরাপদে থাকতে পারছেন কিংবা খালেদা জিয়া চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছেন, সেই ব্যক্তিকেই তারা ‘প্রতিশোধমূলক’ মামলায় জড়িয়েছে।
এটি একটি দ্বিমুখী মানসিকতার উদাহরণ, যেখানে দলীয় স্বার্থ মুহূর্তের মধ্যে ব্যক্তিগত অবদানের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।
মুফতি ফয়জুল করীমের বক্তব্য বিএনপির জন্য এক ধরনের নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করেছে—রাজনীতিতে কৃতজ্ঞতার স্থান কোথায়?
গণসমাবেশে মুফতি ফয়জুল করীম আরও বলেন, জুলাই অভ্যুত্থান কেবলমাত্র নির্বাচন উদ্দেশ্যে হয়নি; বরং রাষ্ট্র সংস্কার ও অপরাধীদের বিচারের দাবিই মূল লক্ষ্য।
তার মতে,
পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতি বাস্তবায়িত হলে সংসদে সব দলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হবে, যা বর্তমান মেজরিটি-বেসড সিস্টেমের বিকল্প হতে পারে।
পিআর পদ্ধতি বাংলাদেশে এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, কিন্তু বিশ্ব রাজনীতিতে এটি ছোট ও মাঝারি রাজনৈতিক দলগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার একটি কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত।
ইসলামী আন্দোলনের এই প্রস্তাব বিএনপির জন্যও একটি সুযোগ হতে পারত, যদি তারা রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির নীতি অনুসরণ করত।
মুফতি ফয়জুল করীমের বক্তব্যে তিনটি বিষয় স্পষ্ট—
বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এখনো প্রতিহিংসা-নির্ভর।
অতীতে সহায়তা পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও দলীয় প্রতিক্রিয়া ‘ক্ষমা’ নয়, বরং ‘শাস্তি’।
ইসলামী আন্দোলন নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করতে বিকল্প নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রস্তাব দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে জোট রাজনীতিতে তাদের দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্মৃতি ও কৃতজ্ঞতা দ্রুত মুছে যায়।
সারজিস ইস্যুতে বিএনপির প্রতিক্রিয়া শুধু একটি ব্যক্তিকে আঘাত নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংকীর্ণতাকে উন্মোচন করেছে।
একই সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন এই সুযোগে নিজেদের প্রস্তাবিত পিআর পদ্ধতিকে সামনে এনে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—বিএনপি কি কেবল ক্ষমতার রাজনীতি খেলতে থাকবে, নাকি নৈতিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতিতে ফেরার কোনো পরিকল্পনা আছে?
