নোয়াখালীর কবিরহাটে ট্রাক ডাকাতি মামলার আসামি যুবদল নেতা সুজনের সঙ্গে থানার ওসি শাহিন মিয়ার ছবি ভাইরাল হয়েছে। এ ঘটনায় প্রশাসনের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় আলোচনায় উঠেছে পুলিশ-রাজনীতির অস্বচ্ছ সম্পর্ক।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পুলিশ ও রাজনীতির সম্পর্ক সবসময়ই বিতর্কিত আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নোয়াখালীর কবিরহাটে সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ছবি আবারও সেই আলোচনাকে তীব্র করেছে। ছবিতে দেখা যায়, আলোচিত ট্রাক ডাকাতি মামলার প্রধান আসামি ও বহিষ্কৃত যুবদল নেতা সুজন ফুল দিয়ে বরণ করছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহিন মিয়াকে।
এই ছবিটি প্রকাশিত হওয়ার পর স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—
একজন আলোচিত মামলার আসামি কীভাবে থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে এমন সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ করতে পারে?
এটি কি শুধুই সৌজন্য বিনিময়, নাকি প্রশাসন-রাজনীতির অস্বচ্ছ সম্পর্কের প্রতিফলন?
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নের মুখে।
রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, বিশেষ সুবিধা প্রদান কিংবা অপরাধীদের ছত্রচ্ছায়া—এসব অভিযোগ নিয়মিত শোনা যায়।
ওসি শাহিন মিয়ার এই ছবিকে অনেকেই সেই ধারাবাহিকতার আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
ছবিটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর কমেন্টে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তৌহিদুল ইসলাম লিখেছেন,
“স্যার, আমার মাথায় একটু হাত রাখবেন, সবসময় খেয়াল রাখবেন। এটাই হলো বাংলাদেশ।”
অন্য একজন লিখেছেন, “সোনার বাংলার রাজনৈতিক অবস্থা।”
এই প্রতিক্রিয়াগুলো জনমানসে গভীর হতাশা ও অবিশ্বাসের ইঙ্গিত বহন করে।
সাধারণ মানুষ মনে করে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে ন্যায়বিচার পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, ওসি শাহিন মিয়া বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
তার দাবি—“কেউ যদি ফুল দেয়, আমি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে সেটিকে সৌজন্য হিসেবে গ্রহণ করেছি।
এর সঙ্গে ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক কোনো স্বার্থ জড়িত নয়।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
যখন একজন আলোচিত মামলার আসামি, যাকে সম্প্রতি পুলিশই গ্রেপ্তার করেছে, সেই ব্যক্তি থানার ওসিকে ফুল দিয়ে বরণ করেন, তখন সেটি কি সত্যিই শুধুই সৌজন্য হিসেবে দেখা যায়?
বাংলাদেশে রাজনৈতিক দল ও অপরাধ জগতের অস্বচ্ছ সম্পর্ক নতুন কিছু নয়।
ক্ষমতার দাপটে অপরাধীরা রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়, আবার রাজনৈতিক নেতারা অপরাধীদের ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করেন।
এ প্রক্রিয়ায় প্রশাসন প্রায়ই বিতর্কিত অবস্থানে পড়ে।
নোয়াখালীর এই ঘটনা সেই প্রাতিষ্ঠানিক সংকটেরই প্রতিফলন, যেখানে পুলিশকে নিরপেক্ষ রক্ষক হিসেবে না দেখে জনগণ দেখে রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষাকারী একটি বাহিনী হিসেবে।
কবিরহাটের এই ছবিটি হয়তো সাময়িক বিতর্ক তৈরি করেছে, কিন্তু এটি বাংলাদেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সমস্যার প্রতিচ্ছবি।
প্রশাসনের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হলে পুলিশকে শুধু নিরপেক্ষ ভূমিকা নয়, সেই নিরপেক্ষতার দৃশ্যমান প্রমাণও দিতে হবে।
কারণ ছবির মতো প্রতীকী ঘটনাও জনমানসে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
