২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা ছিল বিএনপি-জামায়াত সরকারের নির্বাচনী ষড়যন্ত্রের অংশ। আওয়ামী লীগ নিধন ও ভোট লুটের মহড়া হিসেবে রাষ্ট্রীয় মদতে এই জঙ্গিবাদ কিভাবে বেড়ে উঠেছিল তার বিশ্লেষণ।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিভীষিকাময় দিন। দুপুর ১১টার পর মুহূর্তেই ৬৩টি জেলায় ৫০০-এর বেশি বোমা বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে পুরো দেশ। এই ঘটনার উদ্দেশ্য ছিল একটাই—জনগণের মনে ভীতি সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের অবাধ সন্ত্রাস ও ভোট ডাকাতির পথ সুগম করা।
কিন্তু এ হামলার পেছনে যে রাষ্ট্রীয় মদত, রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও নির্বাচনকেন্দ্রিক ষড়যন্ত্র লুকিয়ে ছিল, তা ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে থাকে তদন্ত ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে।
এই প্রবন্ধে ১৭ আগস্টের বোমা হামলার পটভূমি, বিএনপি-জামায়াত সরকারের ভূমিকা এবং দেশের রাজনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করা হলো।
২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ইসলামি জঙ্গি সংগঠনগুলোকে কৌশলে ব্যবহার করতে থাকে।
জেএমবি, হরকত-উল-জিহাদসহ বিভিন্ন চরমপন্থি গোষ্ঠীকে অর্থায়ন, অস্ত্র ও রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়ে সংগঠিত করে বিরোধীদল দমন ও আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করার নীলনকশা আঁকে তারা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখনই জঙ্গিদের ধরত, তখনই শীর্ষ মহল থেকে চাপ আসত তাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য।
উদ্দেশ্য ছিল—
ভয়, রক্তপাত ও হত্যার মাধ্যমে জনমনে সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিয়ে নির্বাচনী মাঠ খালি করে দেওয়া।
সেদিন ৬৩টি জেলায় প্রায় একই সময়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জেএমবি গোটা দেশকে এক ভয়াল বার্তা দেয়।
নিহত হয় ২ জন, আহত হয় অন্তত ৩০০ জন।
সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়।
এটি ছিল আসলে আওয়ামী লীগ নিধন পরিকল্পনার প্রথম ধাপ—যাতে তারা ভয়ে ঘর থেকে বের না হয়, আর বিএনপি-জামায়াত আবারও সন্ত্রাসের ছায়ায় ভোট ডাকাতির মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে পারে।
বিভিন্ন তদন্ত ও গণমাধ্যম প্রতিবেদন স্পষ্ট করে যে, বিএনপি নেতাদের ঘরেই ছিল জঙ্গিদের আস্তানা।
২০ আগস্ট ২০০৫ জনকণ্ঠ: সিরিজ বোমা হামলার পরপরই জেএমবি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবির।
৩-৪ অক্টোবর ২০০৫ জনকণ্ঠ: শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য কোটালিপাড়ায় ৭৫ কেজি বোমা পুঁতে রাখার মতো ভয়াবহ ষড়যন্ত্রেও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রশ্রয় ছিল।
৩০ জানুয়ারি ২০০৭ প্রথম আলো: নাটোরে বিএনপির প্রভাবশালী এমপি রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর বাসায় প্রকাশ্যে ১৫০ জন জঙ্গি নিয়ে বৈঠক করে শায়খ আবদুর রহমান ও বাংলা ভাই।
২৭ জুন ২০০৭ প্রথম আলো: প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমিনুল হক ব্যক্তিগতভাবে খালেদা জিয়ার কাছে তদবির করেন বাংলা ভাইয়ের মুক্তির জন্য।
এসব প্রমাণ স্পষ্ট করে যে, জঙ্গিবাদ ছিল শুধু সন্ত্রাসীদের খেলা নয়, বরং বিএনপি-জামায়াত সরকারের রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ।
১৭ আগস্টের ঘটনার পর সাধারণ মানুষ তীব্র ট্রমার মধ্যে পড়ে।
শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবার মনে ঢুকে যায় ভয়।
বাংলা ভাইয়ের টর্চার সেল, ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাদের টার্গেট কিলিং এবং প্রকাশ্য হত্যাযজ্ঞ ছিল এক অমানবিক অধ্যায়।
আদালত পরে স্পষ্ট করে জানায়, বাগমারায় বিএনপির রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে জেএমবির জন্ম হয়েছিল।
১৭ আগস্টের বোমা হামলা ও ধারাবাহিক জঙ্গি তৎপরতা শেষ পর্যন্ত বিএনপির বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি করে।
পরবর্তী সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপির বহুদিনের পরিকল্পনা বানচাল হয়।
আন্তর্জাতিক মহলও বুঝতে পারে, বাংলাদেশকে তালেবানি রাষ্ট্র বানানোর চক্রান্তে লিপ্ত ছিল খালেদা জিয়ার শাসন।
১৭ আগস্ট শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলা নয়; এটি ছিল বিএনপি-জামায়াতের রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তিকে দমন করা এবং নির্বাচনকে ভোট ডাকাতির মাধ্যমে লুণ্ঠন করা—এই ত্রিমুখী লক্ষ্য পূরণের জন্যই তারা জঙ্গিবাদের উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।
আজ ২০ বছর পরও এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাজনৈতিক স্বার্থে জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া মানে গোটা জাতির নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও গণতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ানোই হতে হবে ভবিষ্যতের নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার শপথ।
