বুড়িগঙ্গা নদী থেকে নারী-শিশুসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ-পুলিশ। দু’জনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। রহস্যজনক এ ঘটনার পেছনে পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক অপরাধ নাকি সংগঠিত হত্যা—তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
রাজধানীর প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী আবারো নৃশংসতার সাক্ষী হলো। শনিবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে নদীর পৃথক স্থান থেকে নারী-শিশুসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ-পুলিশ। ঘটনাটি শুধু একটি সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং বহুমুখী প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—এটি কি আত্মহত্যা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড?
কেরানীগঞ্জের মীরেরবাগ কোল্ড স্টোরেজের কাছ থেকে প্রথমে ৩০ বছরের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার হয়।
তার গলায় বোরকা পেঁচানো অবস্থায় পাওয়া যায়, যা স্পষ্টতই শ্বাসরোধ করে হত্যার ইঙ্গিত দেয়।
অল্প সময়ের মধ্যেই একই স্থান থেকে উদ্ধার হয় তিন বছরের একটি শিশুর মরদেহ।
শিশুটির গলায়ও কাপড় জড়ানো ছিল।
স্থানীয়রা ধারণা করছেন, মা-ছেলেকে একসাথে হত্যা করে পানিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।
একই রাতে, কেরানীগঞ্জের জিনজিরা ইউনিয়নের মাদারীপুর জামে মসজিদের কাছ থেকে আরও দুইটি মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।
৪০ বছরের এক পুরুষ ও ৩০ বছরের এক নারীর শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল।
তাদের পরনের পোশাক, আঘাতের ধরন এবং উদ্ধার স্থানের অবস্থান থেকে এটি কোনো দুর্ঘটনা নয় বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছে পুলিশ।
সদরঘাট ও বরিশুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির কর্মকর্তারা জানান, মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনার কোনো আলামত মেলেনি, বরং শারীরিক আঘাত ও গলায় কাপড় পেঁচানো অবস্থায় মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি হত্যার দিকে ইঙ্গিত করছে।
বাংলাদেশে নদীঘাট, কেরানীগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় প্রায়ই অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার হয়।
তবে একই দিনে নারী-শিশুসহ চারটি মরদেহ উদ্ধার এক নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।
পারিবারিক দ্বন্দ্ব বা ‘ফ্যামিলি ট্র্যাজেডি’ হতে পারে একটি সম্ভাবনা।
অর্থনৈতিক চাপ, দাম্পত্য কলহ বা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থেকে অনেক সময় পরিবার ধ্বংস হয়।
অপরাধী চক্র বা গ্যাং-সংক্রান্ত হত্যাকাণ্ডও হতে পারে আরেকটি দিক।
বিশেষ করে নদী তীরবর্তী এলাকায় চুরি, মাদক ও চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলোর বিরোধে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে।
সংগঠিত অপরাধ ও ঢেকে রাখার প্রচেষ্টাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
মরদেহে কাপড় পেঁচানো, আঘাতের চিহ্ন এবং একই রাতে একাধিক মরদেহ উদ্ধারের বিষয়টি এ আশঙ্কা জোরালো করে।
ঘটনাটি শুধু একটি ক্রিমিনাল কেস নয়, বরং নগর জীবনের নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে এমন ঘটনা প্রমাণ করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষ বুড়িগঙ্গাকে কেবল পরিবহন নয়, জীবিকার অংশ হিসেবেও ব্যবহার করে।
সেখানে যদি এই ধরনের ঘটনা ঘটে, তবে নাগরিক নিরাপত্তার প্রতি আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বুড়িগঙ্গায় উদ্ধার হওয়া চারটি মরদেহ বাংলাদেশের অপরাধচিত্রে নতুন একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে, তবে সুষ্ঠু ময়নাতদন্ত ও অপরাধী চক্র শনাক্তের মাধ্যমে দ্রুত প্রকৃত কারণ প্রকাশ করা জরুরি।
না হলে এই ঘটনা একসময় হারিয়ে যাবে অন্যান্য অমীমাংসিত হত্যাকাণ্ডের ভিড়ে।
