অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন— অনেক উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আঁতাত করে ‘সেফ এক্সিট’ পরিকল্পনা করেছেন। অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও নাগরিক সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের পেছনে এই লেনদেনই বড় কারণ।
অন্তর্বর্তী সরকারের নেপথ্যে চলমান অনিশ্চয়তা, দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতার চিত্র আরও একবার উন্মোচিত করেছেন সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে তিনি যে অভিযোগ তুলেছেন— অনেক উপদেষ্টা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আঁতাত করে নিজেদের ‘সেফ এক্সিট’ নিশ্চিত করার পথে হাঁটছেন— তা কেবল একটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং এই সরকারের ভেতরে জমে থাকা নৈতিক সঙ্কটের বহিঃপ্রকাশ।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের মূল বার্তা স্পষ্ট— অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব কাঠামো, উদ্দেশ্য ও দায়বদ্ধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সরকারের যে অংশটি “নাগরিক সমাজ” বা “নিরপেক্ষ পরামর্শক” হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছিল, তারাই আজ রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।
ফলে এই সরকারের ‘অন্তঃস্থ সততা’ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন,
“উপদেষ্টাদের অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ তৈরি করেছেন। তারা মনে করছেন রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনই তাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে।”
এই বক্তব্যে বোঝা যায়, উপদেষ্টাদের একটি বড় অংশ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখতে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নিচ্ছেন।
এমন প্রবণতা কেবল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেখা গেছে, সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা গণমাধ্যমে দলীয় প্রবণতা প্রকাশ করছেন, কেউ কেউ আবার ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে— এই সরকার আদৌ নিরপেক্ষ থাকতে পেরেছে কি?
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ছাত্রনেতৃত্ব প্রসঙ্গ। তিনি স্বীকার করেছেন, “আমাদের উচিত ছিল ছাত্র নেতৃত্বকেই শক্তিশালী করা।”
এই বক্তব্যে একটি আত্মসমালোচনার আভাস আছে। প্রকৃতপক্ষে, যে ছাত্র আন্দোলনের ভিত্তিতে এই সরকার গঠিত হয়েছিল, সেই শক্তিই এখন প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।
বরং, নানা সুশীল ও রাজনৈতিক ব্যক্তির প্রভাবে সরকারের সিদ্ধান্তগুলো ক্রমে সাধারণ মানুষের দাবি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
ছাত্র নেতৃত্বের মধ্যে বিভাজন, আস্থার সংকট ও প্রভাবশালী মহলের চাপে তারা এখন অনেকটাই প্রান্তিক।
অথচ, ছাত্র সমাজই ছিল এই সরকারের নৈতিক ভিত্তি। নাহিদ ইসলামের এই অভিযোগটি সবচেয়ে গুরুতর।
তিনি বলেছেন,
“অনেক উপদেষ্টা নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।”
এই উক্তি শুধু কয়েকজন ব্যক্তিকে নয়, বরং গোটা ব্যবস্থাকেই সন্দেহের মুখে দাঁড় করায়।
যদি সত্যিই অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে এমন বিশ্বাসঘাতকতা ঘটে থাকে, তাহলে গণ-আকাঙ্ক্ষার যে সরকার হিসেবে এটি আত্মপ্রকাশ করেছিল, তা এখন ক্ষমতার লেনদেনের যন্ত্রে পরিণত হচ্ছে।
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য দুটি প্রশ্নকেই নতুন করে উসকে দিয়েছে। কারণ “সেফ এক্সিট” মানে হচ্ছে রাজনৈতিক দায় এড়িয়ে নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়া।
এটি একদিকে আত্মরক্ষার প্রবণতা, অন্যদিকে জনগণের আস্থা হারানোর প্রতীক।
“সময় এলে আমরা নাম প্রকাশ করব”— নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্য যেন এক রাজনৈতিক সতর্কবার্তা।
এর অর্থ, সরকারের ভেতরে ক্ষমতার খেলা এখনো চলমান এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
এই অবস্থায় প্রশ্ন থেকে যায়— অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা কতদিন টিকে থাকবে?
অন্তর্বর্তী সরকারের জন্ম হয়েছিল এক অভূতপূর্ব গণ-আন্দোলনের পর, জনগণের প্রত্যাশা ছিল— এটি হবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পরিবর্তনের প্রতীক।
কিন্তু আজকের চিত্র একেবারে উল্টো।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ প্রমাণ করছে, এই সরকারের অভ্যন্তরে আস্থাহীনতা, বিভাজন ও ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
যদি সরকার এখনই নিজেকে সংশোধন না করে, তবে ‘সেফ এক্সিট’ শুধু উপদেষ্টাদের জন্য নয়— গোটা সরকারের জন্যও একটি বাস্তবতার প্রতীক হয়ে উঠবে।
