আরাকান আর্মির প্রধান মেজর জেনারেল তুন মিয়াত নাইং রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগ তুলেছেন। পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে তাদের ‘ভালো সম্পর্ক’-এর তুলনায় বর্তমান সরকারের অবস্থান নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা তৈরি করছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা শুধু সীমান্তের নিরাপত্তা নয়, বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতিক ভারসাম্যেরও নতুন রূপ দিচ্ছে। ইরাবতীকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাকান আর্মির (এএ) প্রধান মেজর জেনারেল তুন মিয়াত নাইং অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশের বর্তমান কর্তৃপক্ষ তাদের ওপর ‘বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করছে’, যা পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিপরীত।
এই বক্তব্য কেবল সীমান্ত রাজনীতির ইঙ্গিতই নয়—এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ার জটিল বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
তুন মিয়াত নাইং-এর বক্তব্যে স্পষ্ট—
রোহিঙ্গা ইস্যু কেবল মানবিক সমস্যা নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত একটি ইস্যু।
তিনি বলেন, “১৯৫০-এর দশক থেকে জান্তা রোহিঙ্গা ইস্যুকে আরাকান জাতির বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।”
অর্থাৎ, রাখাইন রাজ্যের জাতিগত রাজনীতি ও মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় জান্তার ক্ষমতাকাঠামো একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
এই প্রেক্ষাপটে আরাকান আর্মি যখন রাখাইনের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে, তখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন প্রশ্নটি তাদের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
তুন মিয়াত নাইং দাবি করেছেন,
বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কিছু অংশ রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের ‘উস্কানি’ দিচ্ছে, যাতে তারা আরাকান আর্মির ঘাঁটিতে হামলা চালায়।
এই অভিযোগ বাস্তব হোক বা না হোক, এমন বক্তব্য দুই দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ককে স্পষ্টতই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, “আমাদের জাতীয় স্বার্থ দাবি করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের জন্য যা প্রয়োজন তা করতে হবে।”
কিন্তু যখন সীমান্তে সংঘর্ষ ও গুলিবিনিময় বাড়ছে, তখন এই “জাতীয় স্বার্থ” কৌশলগত ভারসাম্যের নতুন পরীক্ষায় পড়েছে।
তুন মিয়াত নাইং সাক্ষাৎকারে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ও অন্যান্য জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ঐক্যের কথাও উল্লেখ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের জন্য রাখাইন রাজ্য একটি ভূরাজনৈতিক করিডর, যেখানে কিয়াউকফিউ বন্দর থেকে শুরু করে তেল-গ্যাস পাইপলাইন পর্যন্ত সবকিছু কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন চীনের জন্য একধরনের সুযোগ তৈরি করতে পারে—যা রাখাইন ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তন আনতে পারে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
উত্তর রাখাইনের বর্তমান অবস্থা ‘বিপর্যয়কর’, যেখানে জোরপূর্বক শ্রম, খাদ্য সংকট, ও চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা চলছে।
এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের কথা বলা মানে একপ্রকার মানবিক বিপর্যয়কে পুনরায় আমন্ত্রণ জানানো।
তুন মিয়াত নাইং বললেও যে কিছু রোহিঙ্গা পরিবার ফিরে এসেছে, তা এখনো বিচ্ছিন্ন ও অপ্রমাণিত তথ্য।
বাস্তবতা হলো—নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবর্তন কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
রাখাইন রাজ্যের সংঘাত এখন কেবল একটি স্থানীয় বিদ্রোহ নয়, বরং এটি আঞ্চলিক কূটনীতির একটি নতুন ফ্রন্ট।
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান যেখানে মানবিক সমাধান ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে, সেখানে আরাকান আর্মি নিজেদের রাজনৈতিক বৈধতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।
এই দুই বাস্তবতার সংঘাতই রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়াকে জটিল করছে।
আর যদি পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও গভীর হয়, তবে রাখাইন ও বাংলাদেশের সীমান্তে শান্তির সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে।
