ঢাকার রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বিদেশি মাফিয়া চক্রের চাঁদাবাজি বেড়েছে। দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া থেকে ফোনে হুমকি, ১২ শোরুমে ককটেল হামলা এবং ৪০ ব্যবসায়ী টার্গেটে। পুলিশের তদন্তে সীমাবদ্ধতা ও আইনশৃঙ্খলার সংকট বাড়াচ্ছে উদ্বেগ।
রাজধানীর রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীরা এখন এক অদৃশ্য আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের ব্যবসায়িক নিরাপত্তা আজ ‘বিদেশি মাফিয়া নেটওয়ার্ক’-এর হাতে জিম্মি। গত ছয় মাসে অন্তত ৪০ ব্যবসায়ী ফোনে চাঁদার হুমকি পেয়েছেন, আর ১২টি শোরুমে ঘটেছে ককটেল হামলা। এই চাঁদাবাজ চক্রের হোতারা দেশীয় নয়—তারা অবস্থান করছে দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো প্রবাসী কেন্দ্রগুলোতে।
বারভিডা (BARVIDA)-এর তথ্য বলছে, এই হুমকিগুলো এসেছে সুসংগঠিতভাবে এবং ‘মাফিয়া স্টাইল’-এ।
ফোনে দাবি করা হয়েছে পাঁচ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা।
ভুক্তভোগীদের সন্তানদের স্কুলের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে অপহরণের—যা নির্দেশ করে একটি অত্যন্ত গোছানো নজরদারি নেটওয়ার্ক।
হুমকিদাতাদের মধ্যে ‘কাশেম দ্বীপ’, ‘দাদা বিনোধ’ ও ‘পটকা বাবু’ নাম উঠে এসেছে।
তারা নিজেদের রাজনৈতিক সংগঠনের সাবেক নেতার পরিচয় দিয়ে ভয়ভীতি ছড়াচ্ছেন।
পুলিশ নিশ্চিত করেছে, দ্বীপ ও বিনোধ বিদেশে অবস্থান করছেন।
ফলে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়াও জটিল হয়ে পড়ছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এমনকি মানববন্ধন করেও তারা নিরাপত্তা পাননি।
বরং মানববন্ধনের পরই নতুন হুমকি এসেছে বিদেশ থেকে।
এতে স্পষ্ট—চক্রটি শুধু ভয় নয়, প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভেঙে দেওয়ার কৌশলও জানে।
বিদেশি চক্রের পাশাপাশি ঢাকার ভেতরেও একদল ‘নতুন প্রজন্মের চাঁদাবাজ’ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
পুলিশ সম্প্রতি নিয়াজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে, যারা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া হয়েও অস্ত্রের মুখে ব্যবসায়ীকে জিম্মি করে টাকা ও গাড়ি লুট করেছে।
এই প্রজন্মের চাঁদাবাজি কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়; এটি এক সামাজিক সংকেত—শিক্ষিত শ্রেণির একাংশও দ্রুত অর্থ উপার্জনের জন্য অপরাধপথে নামছে।
পুলিশ বলছে, বিদেশি নম্বর থেকে ফোন আসায় তদন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাশাপাশি ডিএমপির সাইবার ইউনিটও যুক্ত হয়েছে, কিন্তু সক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রতিদিনের অবরোধ ও আন্দোলন মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যস্ত থাকায় অপরাধ দমনে মনোযোগ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়েছে।
ফলে, ব্যবসায়ীদের কাছে এখন ‘বিনিয়োগ ঝুঁকি’ শুধু বাজারমূল্যের নয়, বরং জীবনেরও।
মিরপুর-পল্লবীতে পুরনো মুখ, নতুন ভয়
রাজধানীর মিরপুর, পল্লবী ও মোহাম্মদপুরে এখনো চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা সক্রিয়।
মামুন, জামিল ও মশিউর—এই তিন ভাই বিদেশে থেকেও স্থানীয় অপরাধ নেটওয়ার্ক চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
তাছাড়া পিচ্চি হেলাল ও ইমনসহ জামিনপ্রাপ্ত পুরনো সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করেও চলছে চাঁদাবাজি।
রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেট, নির্মাণ প্রকল্প ও গাড়ি শোরুমে তাদের নামেই এখন ভয় ছড়ানো হচ্ছে।
এই পুরো চিত্রটি বাংলাদেশের নগর অপরাধ কাঠামোতে এক নতুন অধ্যায় খুলেছে—বিদেশ থেকে পরিচালিত স্থানীয় সন্ত্রাস।
এতে শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, দেশের অর্থনীতিও হুমকির মুখে পড়ছে।
রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি খাত, যা বছরে হাজার কোটি টাকার, এখন বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় ভুগছে।
পুলিশের জন্য এটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়, কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও।
বিদেশে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা না হলে এই নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
ঢাকার রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসা এখন এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের টার্গেটে।
বিদেশি কল, ককটেল বিস্ফোরণ আর অপহরণের হুমকিতে ভীত ব্যবসায়ীরা অপেক্ষা করছেন কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি প্রযুক্তি, কূটনীতি ও গোয়েন্দা সহযোগিতা একসঙ্গে ব্যবহার করতে না পারে, তবে এই ‘দূরনিয়ন্ত্রিত অপরাধ সাম্রাজ্য’ রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকেই ভেঙে দিতে পারে।
