অক্টোবরে দেশে অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে। মানবাধিকার সংস্থা এমএসএফ বলছে, মানবাধিকার পরিস্থিতি এখন গভীর সংকটে।
ঢাকা, শুক্রবার — দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) অক্টোবর মাসের প্রতিবেদন বলছে, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা সেপ্টেম্বারের তুলনায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারে ভয়াবহ বৃদ্ধি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরে দেশে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে ৬৬টি, যা গত সেপ্টেম্বরের তুলনায় ১৪টি বেশি। সেপ্টেম্বরে উদ্ধার হয়েছিল ৫২টি লাশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এসব লাশ উদ্ধার করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির পরিচয় অজানা থেকে যাচ্ছে। সঠিক তদন্ত, ময়নাতদন্ত ও পরিচয় শনাক্তকরণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
কারা হেফাজতে মৃত্যু বেড়ে দ্বিগুণ
অক্টোবরে ১৩ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে কারা হেফাজতে, যা গত মাসের ৮ জন থেকে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। মৃতদের মধ্যে ৬ জন কয়েদি ও ৭ জন হাজতি।
এমএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, “কারা হেফাজতে মৃত্যুর এই বৃদ্ধি শুধু উদ্বেগজনক নয়, এটি বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার চর্চার ব্যর্থতাকে স্পষ্ট করে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় রক্তাক্ত অক্টোবর
এমএসএফের প্রতিবেদন বলছে, অক্টোবর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৯টি ঘটনায় আহত ও নিহত হয়েছেন ৫৪৯ জন মানুষ। সেপ্টেম্বরে এই সংখ্যা ছিল ২৯৬ জন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি সহিংসতার এই বৃদ্ধি ঘটিয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র
অক্টোবরে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৮টি, যা সেপ্টেম্বারের তুলনায় ৭টি বেশি।
এর মধ্যে
- ধর্ষণের অভিযোগ: ৭২টি
- দলবদ্ধ ধর্ষণ: ১৪টি
- ধর্ষণের পর হত্যা: ৭টি
এছাড়া ৫ জন প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি: অস্থির ও উদ্বেগজনক
এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী-শিশু নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘উদ্বেগজনক ও অস্থির’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সংস্থাটি আরও বলেছে,
“আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার করে থেমে যাচ্ছে, কিন্তু পরিচয় শনাক্ত বা তদন্তের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বলছেন,
- এটি কেবল সংখ্যার খেলা নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার গভীর প্রতিফলন।
- হেফাজতে মৃত্যুর বৃদ্ধি বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
- অজ্ঞাত লাশের সংখ্যা বাড়া মানে নিখোঁজের ঘটনাও বেড়ে চলেছে, যা জনগণের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করছে।
রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা কোথায়?
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা উদ্বেগজনক।
যেখানে সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয়, সেখানে অজ্ঞাত লাশ ও হেফাজতে মৃত্যুর বৃদ্ধি রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর উদাহরণ।
মানবাধিকার পুনরুদ্ধারে করণীয়
বিশ্লেষকরা প্রস্তাব দিয়েছেন—
- সকল হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা স্বাধীন তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে অনুসন্ধান।
- প্রতিটি অজ্ঞাত লাশের পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ প্রোফাইলিং চালু করা।
- রাজনৈতিক সহিংসতা দমনে প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করা।
- মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাজের স্বাধীনতা বজায় রাখা।
সারসংক্ষেপ
অক্টোবরে অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা বাংলাদেশের মানবাধিকার বাস্তবতায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে দেশের বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
রেফারেন্স লিঙ্ক:
- মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (MSF) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
- প্রথম আলো: হেফাজতে মৃত্যু ও অজ্ঞাত লাশ বৃদ্ধি নিয়ে প্রতিবেদন
- ঢাকা ট্রিবিউন: Bangladesh Human Rights Situation Report
