শেখ হাসিনা রায় ও ৩২ ভাঙার নাটকের আড়ালে চুপিচুপি লালদিয়া টার্মিনাল এপিএম টার্মিনালসকে দিতে চুক্তি সই করল ইউনুস সরকার—উঠছে অনিয়মের অভিযোগ।
বিশেষ প্রতিবেদন | তদন্ত ডেস্ক
শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে সারাদেশ যখন চরম অস্থিরতার মধ্যে ডুবে আছে, ঠিক সেই মুহূর্তে একটি ভয়ঙ্কর ও বিতর্কিত অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত চুপিসারে কার্যকর করেছে অন্তর্বর্তীকালীন ইউনুস সরকার। চট্টগ্রামের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে সরকার ডেনমার্ক-ভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস (APM Terminals) এর সঙ্গে চুক্তি সই করেছে—এমন তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর বিশেষজ্ঞ মহলে তৈরি হয়েছে তুমুল আলোচনা।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—
“৩২ ভাঙা, মারামারি আর রায়ের নাটকের আড়ালে কি সরকার বন্দরের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দিল?”
লালদিয়া: শুধু টার্মিনাল নয়, এটি একটি কৌশলগত গেটওয়ে
চট্টগ্রাম বন্দর এশিয়ার অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্রবন্দর।
এখানে নতুন টার্মিনাল হলে—
- দেশের মোট আমদানি–রপ্তানির ৯০% এখান দিয়ে যাবে
- বৈদেশিক বাণিজ্যের গতি বাড়বে
- বন্দর নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আসবে
বিশেষজ্ঞদের দাবি, বন্দরের যেকোনো মালিকানা বা পরিচালনাসংক্রান্ত চুক্তি কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তা, ভূরাজনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও পরিণত হয়। ফলে চুক্তিতে থাকা সংবেদনশীল ধারা যাচাই-বাছাইসহ অংশীজনদের মতামত ও বিভিন্ন ধরনের পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। বর্তমানে হতে যাওয়া চুক্তিগুলোয় কী আছে তা কেউ জানে না।
কিন্তু প্রশ্ন:
এমন কৌশলগত স্থাপনা বিদেশি কোম্পানিকে দিতে এত তড়িঘড়ি কেন?
চুক্তির সময় ও গোপনীয়তা নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
কেন এত গোপনীয়তা?
সূত্র বলছে—
চুক্তিটি সরকারি ওয়েবসাইট, মন্ত্রণালয় বা বন্দরের নিয়মিত বিবৃতিতেও প্রকাশ করা হয়নি।
বরং বিষয়টি “ঝড় তুলতে পারে”—এ ভয়ে চুপিসারে নথি সই করা হয়েছে।
বোর্ড সভায়ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, সভায় প্রয়োজন ছিল চারজন সদস্যের, ছিলেন মাত্র দুজন। চবক আইনে বোর্ডে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে তিন-চার সদস্যের ভোট প্রয়োজন। কিন্তু এ দুই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এমন এক বোর্ড সভায়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন মাত্র দুই সদস্য। তাদের সম্মতি নিয়েই বিষয়গুলো অনুমোদন করা হয়।
বন্দর ব্যবহারকারী সংগঠনগুলোর কোনো সদস্যকেই পুরো প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়নি বলে অভিযোগ করছে পোর্ট ইউজার্স ফোরাম। সংগঠনের একজন সিনিয়র সদস্য বলেন, ‘সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছতার সঙ্গে হয়েছে। ৯ নভেম্বর বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সেদিনই নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় কাগজপত্র। পরদিন ১০ নভেম্বরই তা আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়। এত দ্রুততম সময়ে এমন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া নজিরবিহীন। সব মিলিয়ে তাড়াহুড়ো, অস্বচ্ছতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। তাই একের পর এক প্রশ্ন উঠছে।’
প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, উভয় চুক্তিই দেশের জন্য বড় ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অস্বাভাবিক গোপনীয়তায় এগুলোর বিষয়াদি চূড়ান্ত হয়েছে। এতে পরবর্তী সময়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে আগামীকাল লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনালের চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রাপ্ত হবে। তার ভিত্তিতে বিনিয়োগকারীকে পিপিপি অনুযায়ী নির্ধারিত সময় দিয়ে নোটিস অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) প্রদান করতে হবে। বিনিয়োগকারী এনওএ গ্রহণ করলে এককালীন পরিশোধযোগ্য অর্থ ও মূল চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ পারফরম্যান্স গ্যারান্টি হিসেবে জমা দেবেন। লালদিয়া টার্মিনালের চুক্তির ক্ষেত্রে যা প্রায় ৫ কোটি ডলার সমমূল্যের। পিপিসি অ্যাক্ট অনুযায়ী এ অর্থ জমা দেয়ার পরই কেবল চুক্তি সম্পাদন হতে পারে।
কিন্তু এক্ষেত্রে অত্যন্ত তাড়াহুড়ো করে, বৈদেশিক মুদ্রা জমা না নিয়ে, যথাযথ প্রক্রিয়ার বেশকিছু ধাপ বাদ দিয়ে চুক্তি করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
চুক্তি নিয়ে অভিযোগ:
আরো অভিযোগগুলো হলো—
.১। টেন্ডার হয়নি, দরপত্র আহ্বান হয়নি
লালদিয়া টার্মিনালের মতো বড় প্রকল্প সাধারণত আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে হয়।
২। বন্দরের অথরিটি ও NBR অনেক কিছু জানতেই পারেনি
এটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেরও লঙ্ঘন।
৩। APM-এর লাভের ভাগ কী হবে—সরকার জানায়নি
লাভের ৩০%–৮০% হয়নি কি? সময়সীমা ৩০ বছর?
নাকি ৪০ বছরের লিজ?
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনালের চুক্তিগুলোর শর্ত ও বিষয়াদি কীভাবে অনুমোদন দেয়া হচ্ছে, তা নিয়ে স্পষ্ট নীতিগত ঘোষণা নেই। সরকারি সূত্র তথ্য দিচ্ছে না, বন্দর কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিচ্ছে না। অভ্যন্তরীণ কয়েকটি সূত্র দাবি করেছে চুক্তিগুলো পিপিপি কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিদেশী অপারেটর বিল্ড-অপারেট-ট্রান্সফার পদ্ধতিতে টার্মিনাল পরিচালনার অধিকার পাবে। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা আদৌ কি পুনরুদ্ধার করা যাবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদে অপারেটরেরই নিয়ন্ত্রণ থাকবে, এ ধরনের বিষয়গুলো অনিশ্চিত।
ধরনা করা হয়, তারাই হবে আগামী ৩০ থেকে ৪০ বছরের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক টার্মিনালের অন্যতম মালিক। কেউ কিছু জানে না।
৪। রাজনৈতিক নাটক দিয়ে বিষয়টি চাপা দেওয়ার অভিযোগ
অনেকেই বলছেন—
“৩২ ভাঙা, ভাঙচুর, ককটেল—সবকিছুই বড় বিষয় ঢাকার জন্য এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি করা।
APM Terminals: কোম্পানির ট্র্যাক রেকর্ডও বিতর্কিত
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এপিএম-এর বিরুদ্ধে—
- অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ
- উচ্চ চার্জ
- কৌশলগত প্রভাব বিস্তার
- সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ
—এমন অভিযোগ আছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কেন বাংলাদেশ এত দ্রুত তাদের হাতে বন্দর দিচ্ছে?
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন—এটি “স্ট্র্যাটেজিক লস”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অর্থনীতিবিদের ভাষায়—
“বন্দর মানেই কৌশলগত ক্ষমতা।
এটি কোন অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয় নয়।”
অপর এক বন্দর বিশেষজ্ঞ বলেন—
“বেসামরিক অস্থিরতা কাজে লাগিয়ে তড়িঘড়ি চুক্তি করা আন্তর্জাতিকভাবে খুব পরিচিত একটি কৌশল। একে বলে Crisis Opportunism।”
জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তিতে গ্যারান্টিবিষয়ক ধারা থাকে। এ ধারায় সাধারণত রাষ্ট্র বা বন্দর কর্তৃপক্ষ বেসরকারি বিনিয়োগকারীর জন্য নির্দিষ্ট মুনাফা, সর্বনিম্ন কার্গো হ্যান্ডলিং ভলিউম অথবা নীতিগত স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয়। এ ধারায় রাজস্ব গ্যারান্টি থাকতে পারে। এক্ষেত্রে আয় না হলে সরকার ক্ষতিপূরণ দেয়।
আবার চাহিদা গ্যারান্টির বিষয়ও থাকে। যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ কনটেইনার বা কার্গো বন্দর দিয়ে যাবে বলে নিশ্চয়তা দেয়া হয়। না হলে রাষ্ট্র নিজ খরচে বন্দর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। এ রকম ঘটলে বন্দরের লাভের চাপ জনগণের ওপর এসে পড়ে। এমন ঝুঁকি শ্রীলংকা ও কেনিয়ার মতো বহু দেশ এরই মধ্যে মোকাবেলা করেছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের প্রশ্ন: “কার স্বার্থে এই চুক্তি?”
অনেকেই বলছেন—
- ইউনুস সরকার বৈদেশিক শক্তির চাপের মুখে চুক্তি করেছে
- দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটের সুযোগ নেওয়া হয়েছে
- সরকার বন্দর নিয়ন্ত্রণ বিদেশিদের হাতে দিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাচ্ছে
এমনও অভিযোগ রয়েছে—
“এটি বিনিয়োগ নয়, বরং বন্দর হস্তান্তরের সূক্ষ্ম প্রক্রিয়া।”
নাটকের আড়ালে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস
শেখ হাসিনার রায়কে কেন্দ্র করে সারা দেশে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক নাটক চললেও—
ইউনুস সরকারের নীরব, গোপন ও দ্রুতগতির বন্দর চুক্তিই আসলে বড় খবর।
কারণ—
- রাজনীতি বদলায়
- সরকার বদলায়
- কিন্তু বন্দর একবার গেলে আর ফিরে আসে না।
এই চুক্তি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য, কূটনীতি ও কৌশলগত সার্বভৌমত্বের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে—এমন শঙ্কাই এখন বিশেষজ্ঞদের মনে।
