বঙ্গবন্ধুর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ না নেওয়ার দাবি ভ্রান্ত। ঐতিহাসিক নথি প্রমাণ করে তিনি সেদিনই রাষ্ট্রপতির শপথ নেন।
সম্প্রতি এস এম শাহরিয়ার কবির নামে এক ব্যক্তি এবং ব্যারিস্টার ফুয়াদ দাবি করেছেন, “বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ দেশে ফিরে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেননি”। তাঁদের মতে, সেদিন রাষ্ট্রপতির পদে কোনো বৈধ শপথ হয়নি এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কার্যক্রম নাকি শুরু থেকেই অবৈধ ছিল।
ইতিহাসবিদ, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক নথি পরীক্ষা করলে এ দাবি যে সম্পূর্ণ অসত্য, তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রকৃতপক্ষে, ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন—এমন প্রমাণ কেবল মৌখিক নয়, লিখিত এবং স্বাক্ষরযুক্ত সরকারি নথিতে বিদ্যমান।

বঙ্গবন্ধুর স্বহস্তে লেখা শপথনামা: অস্বীকার করার সুযোগ নেই
সরকারি আর্কাইভ ও বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য উৎসে থাকা নথি অনুযায়ী—
- ১০ জানুয়ারি ১৯৭২
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতির শপথ গ্রহণ করেন। - তিনি স্বহস্তে শপথনামা লিখে তাতে নিজ হাতে স্বাক্ষর করেন।
- এ দলিল আজও দেশ-বিদেশের একাধিক আর্কাইভে সংরক্ষিত।
এই নথিই প্রমাণ করে—
যে দাবি করা হচ্ছে, তার কোনো ঐতিহাসিক বা আইনি ভিত্তি নেই।
১১ জানুয়ারি অস্থায়ী শাসনতন্ত্র, ১২ জানুয়ারি নতুন শপথ
এরপর ঘটনাগুলো ঘটে ধারাবাহিকভাবে ও সুসংগঠিতভাবে—
১১ জানুয়ারি ১৯৭২
অস্থায়ী সংবিধান বা Provisional Constitution of Bangladesh জারি করা হয়।
১২ জানুয়ারি ১৯৭২
- বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। - বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।
- প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম নতুন রাষ্ট্রপতিকে শপথ পড়ান।
এর আগে—
- বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন,
- তাজউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন,
যাতে নতুন সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী সরকার গঠন করা যায়।
অর্থাৎ ঘটনাগুলো ছিল পরিকল্পিত, সাংবিধানিক এবং সম্পূর্ণ বৈধ।
পত্রিকার আর্কাইভ প্রমাণ করছে বাস্তবতা
১৩ জানুয়ারি ১৯৭২-এর দৈনিক বাংলা, পিপলস, পাকিস্তান অবজারভার, এমনকি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও—
বঙ্গবন্ধুর রাষ্ট্রপতি ও পরে প্রধানমন্ত্রীর শপথের ছবি ও সংবাদ প্রকাশিত হয়। এই আর্কাইভগুলো আজও সেই সত্যের সাক্ষী।
অজ্ঞতা অপরাধ নয়, কিন্তু মিথ্যা প্রচার অপরাধ
ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞতা দোষ নয়।
কিন্তু ইতিহাস না জেনে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেওয়া, বিশেষত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ভ্রান্ত দাবি তোলা—
এটি কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই নয়, বরং জাতিকে ভুল পথে পরিচালিত করার গভীর প্রচেষ্টা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিটি ধাপ নথিবদ্ধ।
এসব নথি অস্বীকার করা মানে রাষ্ট্রের জন্মকে অস্বীকার করা।
ইতিহাসকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করাই সবার দায়িত্ব
বঙ্গবন্ধুর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখের রাষ্ট্রপতি শপথ কখনো বিতর্কিত ছিল না।
এটি সন্দেহ করার কোনো স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক ভিত্তি নেই।
সুতরাং এ ধরনের ভ্রান্ত দাবি কেবল ভুল তথ্য নয়, বরং ইতিহাস বিকৃতির বিপজ্জনক প্রবণতা।
জাতিকে বিভ্রান্ত করা বন্ধ করতে প্রত্যেক নাগরিকের উচিত নির্ভরযোগ্য নথির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।
রেফারেন্স নোট (নিউজ লিঙ্ক ফরম্যাটে উল্লেখযোগ্য উৎস):
- বাংলাদেশ সরকারি আর্কাইভ
- দৈনিক বাংলা আর্কাইভ (১৩ জানুয়ারি ১৯৭২)
- Provisional Constitution Order, ১১ জানুয়ারি ১৯৭২
- Judicial Oath Records (Supreme Court Archive)
