আইসিটি রায়ের পর ভূমিকম্পকে ‘আল্লাহর খেলা’ বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বন্দরের লিজ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও রায় নিয়ে প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় ঘোষণার পরই পরপর হওয়া ভূমিকম্পকে ‘আল্লাহর খেলা’ আখ্যা দিয়ে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এক অডিও বার্তায় তিনি বলেন, তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের দিনই বন্দর লিজের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা ও তার পরপর দেশে একাধিক কাঠামোগত ভূমিকম্প “কাকতালীয় নয়, আল্লাহরই খেলা।”
আইসিটি-১ আদালতের রায় অনুযায়ী, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একই মামলায় পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সোমবার (১৭ নভেম্বর) বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
‘আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিলো, তারপরই ভূমিকম্প’ — হাসিনা
অডিও বার্তায় হাসিনা অভিযোগ করেন, তাঁর শাসনামলে দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন হতো, তাই এত প্রাণহানি হত না। তিনি বলেন—
“আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিলো, সেদিনই আবার পোর্ট বিক্রির চুক্তি করে ফেললো। তারপরই ব্যাপকভাবে ভূমিকম্প হলো। এটা আল্লাহরই একটা খেলা।”
তিনি নিহতদের জন্য দোয়া করেন এবং আহতদের দ্রুত চিকিৎসা প্রদানের দাবি জানান। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের অদক্ষতাকে দায়ী করেন।
চট্টগ্রাম বন্দরের লিজ নিয়ে আইনি জটিলতা
শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ–প্রক্রিয়াকে “গোপন চুক্তি” হিসেবে আখ্যা দেন।
হাইকোর্ট:
- ৩০ জুলাই চুক্তির বৈধতা প্রশ্নে রুল জারি করে
- ৪ ডিসেম্বর শুনানিতে সিনিয়র বিচারপতি ফাতেমা নজীব চুক্তি প্রক্রিয়া স্থগিতের মত দেন
- জুনিয়র বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রিট খারিজ করেন
ফলে বিষয়টি এখনো বিচারাধীন অবস্থায় ঝুলে আছে।
ভূমিকম্পে ১০ মৃত্যু—৪ দিনে ৪টি কম্পন
১৭ নভেম্বরের রায়ের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক ভূমিকম্প হয়, যা রাজনৈতিকভাবে আরও আলোচনার জন্ম দেয়।
২১ নভেম্বর, সকাল ১০:৩৮ মিনিটে:
- মাত্রা: ৫.৭
- উৎপত্তি: নরসিংদীর মাধবদী
- মৃত্যু: ১০ জন
- বিভিন্ন ভবনে ফাটল দেখা দেয়
এর পর ২২, ২৩, ২৬ নভেম্বর এবং ৪ ডিসেম্বর—টানা চারদিন দেশে মৃদু কম্পন অনুভূত হয়।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এগুলো সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যম মাত্রার সক্রিয় কম্পনধারা, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে টেকটনিক চাপ-বৃদ্ধির স্বাভাবিক ইঙ্গিত। তবে রাজনৈতিক মহলে অভিযোগ—হাসিনার মন্তব্য বিষয়টিকে অযথা ধর্মীয় রূপ দিতে পারে।
রাজনৈতিক প্রভাব: ‘ধর্মীয় ব্যাখ্যা’ নাকি চাপ সৃষ্টির কৌশল?
বিশ্লেষকদের মতে, আইসিটি রায়ের পর হাসিনার বক্তব্য তিনভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে—ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বার্তা—সমর্থকদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে এই বার্তা দেওয়া যে, এই দেশ পীর-আউলিয়াদের দেশ। তাই এই দেশে আল্লাহ অন্যায় সহ্য করেন না, তারই নমুনা এই ভুমিকম্প।
বন্দর লিজ ও ভূমিকম্প মোকাবিলায় ব্যর্থতা তুলে ধরে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা চেষ্টা করেন।
কিন্তু বিরোধী মহল বলছে, একটি বড় ভূমিকম্পকে এভাবে “আল্লাহর খেলা” বললে জনগণের ধর্মের প্রতি আস্থাকে প্রমান করেন।
উপসংহার
আইসিটি রায়, চট্টগ্রাম বন্দর লিজ, ও ভূমিকম্প—এই তিনটি ঘটনা একসঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে।
শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক মন্তব্য আঞ্চলিক রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও বিচারব্যবস্থার আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
বিষয়গুলো নিয়ে সরকার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না দিলেও জনমনে প্রশ্ন—এ বিতর্ক আরও বড় কোনো রাজনৈতিক স্রোতের সংকেত কি না।
