হায়দরাবাদ হাউসে মোদি–পুতিন বৈঠকে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, পারমাণবিক ও বাণিজ্যে বড় চুক্তি সই। ২০৩০ সালে দুই দেশের বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হায়দরাবাদ হাউসে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য, পরিবহন এবং পারমাণবিক শক্তি খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। ২৩তম ভারত–রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। বৈঠক শেষে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে পুতিন বলেন—
“ভারতে যেমন বলা হয় ‘সাথ চলো, সাথ বঢ়ো’, ঠিক সেই নীতিতেই রাশিয়া ও ভারত এগোচ্ছে।”
তিনি আরও জানান যে, রাশিয়া–ভারত সম্পর্ক শুধু বন্ধুত্ব নয়, বরং “বিশেষ ও বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত কৌশলগত অংশীদারিত্ব” যা ভবিষ্যতে আরও দৃঢ় হবে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা: ব্রহ্মোস থেকে এস-৪০০
দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বৈঠকের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল। আলোচনায় উঠে আসে—
ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্রের যৌথ উৎপাদন সম্প্রসারণ
রাশিয়া ও ভারত দীর্ঘদিন ধরে ব্রহ্মোসের যৌথ উৎপাদনে কাজ করছে। এবার উৎপাদন ক্ষমতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ
ভারতের কাছে সরবরাহ করা এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও আপগ্রেড নিয়ে নতুন সমন্বয় হতে যাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি হস্তান্তর
পুতিন পুনর্ব্যক্ত করেন যে রাশিয়া শুধু অস্ত্র বিক্রি করে না—যৌথ প্রযুক্তি উন্নয়নই ভারত–রাশিয়ার সম্পর্কের মূল ভিত্তি।
জ্বালানি ও তেল সরবরাহ: নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাশিয়ার অঙ্গীকার
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট জানান—
“পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরোয়া না করেই ভারতকে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।”
রাশিয়া বর্তমানে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল সরবরাহকারী। পুতিন জোর দিয়ে বলেন, এই সরবরাহ শৃঙ্খল আরও স্থিতিশীল হবে।
বাণিজ্যের লক্ষ্য: ২০৩০ সালে ১০০ বিলিয়ন ডলার
দুই নেতাই সম্মত হয়েছেন যে—
- ভারত–রাশিয়ার মোট বাণিজ্য ২০২৫ সালে প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলার।
- আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ দ্বিগুণ বৃদ্ধি করে ১০০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করা হয়।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—
- জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য
- জাহাজ চলাচল ও লজিস্টিক করিডোর
- কৃষি, সার ও খনিজ সম্পদ বাণিজ্য
পারমাণবিক শক্তি সহযোগিতা: কুদানকুলাম প্রকল্পে নতুন ইউনিট
শীর্ষ বৈঠকে ভারতের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক প্রকল্প কুদানকুলাম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্টের নতুন ইউনিট নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়।
- নতুন ইউনিট স্থাপন
- প্রযুক্তি বিনিয়োগ
- জ্বালানি নিরাপত্তা সহযোগিতা
দুই দেশই ভবিষ্যৎ জ্বালানি কৌশলের ভিত্তি হিসেবে পারমাণবিক শক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
মোদির মন্তব্য: আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য সম্পর্ক জরুরি
প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন—“ভারত–রাশিয়া সম্পর্ক কেবল দু’দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্ব স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।”
তিনি রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক, প্রযুক্তি ও জ্বালানি সহযোগিতাকে “নিরাপত্তা আর্কিটেকচারের স্তম্ভ” হিসেবে বর্ণনা করেন।
সফরের তাৎপর্য
বিশ্লেষকদের মতে—
- যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখা ভারতের জন্য অপরিহার্য।
- রাশিয়া–ভারত সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়া এবং ইন্দো-প্যাসিফিক জোটের রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে।
- পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভারতের রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করা বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
