ভারতীয় অর্থায়ন বাতিল হওয়ায় বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পে AIIB-এর ঋণ। সাত বছর দেরিতে ডলারের দাম বৃদ্ধিতে ব্যয় বাড়ছে ৫০০০ কোটি; ইউনুস সরকারের অদক্ষতা ও লুটপাটের চিত্র?
ঢাকা, ৯ ডিসেম্বর: দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জের শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি এখন এক বিশাল আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে। ভারতীয় ‘লাইন অব ক্রেডিট’ (এলওসি) থেকে অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে প্রকল্পটি এখন চীনের উদ্যোগে গঠিত এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি)-এর ঋণে বাস্তবায়িত হতে চলেছে। তবে এই দীর্ঘ সময়ক্ষেপণের ফলস্বরূপ বাংলাদেশকে অতিরিক্ত প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা খেসারত দিতে হতে পারে, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—এই বিশাল ব্যয় বৃদ্ধি কি নিছকই মুদ্রাস্ফীতি, নাকি ইউনুস সরকারের অদক্ষতা ও লুটপাটের আরেকটি চিত্র?
ভারতীয় অর্থায়ন বাতিল: কৌশলগত পটপরিবর্তন
এই প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে।
২০১৮ সালে ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে একনেকে অনুমোদিত এই প্রকল্পে ভারতের এলওসির আওতায় ৩ হাজার ১৪৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু নানা কারণে অর্থায়নে অনিশ্চয়তা এবং কাজে গতি না থাকায় ভারত সরে আসে।
বিশেষ করে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তন এবং ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার পুনর্মূল্যায়নের কারণে এই কর্মসূচির গতি থেমে যায়।
ভারত সরকার বাংলাদেশে রেলের আরও দুটি প্রকল্পেও অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ৫ই মার্চের দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় এই প্রকল্পকে এলওসি তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়।
এআইআইবির প্রবেশ: ৭ বছরের বিলম্ব এবং দ্বিগুণ ব্যয়
ভারতীয় অর্থায়ন বন্ধ হওয়ার পর চীনের উদ্যোগে গঠিত এআইআইবি এই প্রকল্পে ঋণ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
গত ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ে এআইআইবির ঋণ নেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে।
২০১৫ সালে এআইআইবির যাত্রা শুরু হলেও, এই পুরোনো প্রকল্পে নতুন অর্থায়ন হওয়ায় মাঝে চলে গেছে প্রায় সাত বছর।
প্রকল্প দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এই দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া এবং নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পের ব্যয় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
প্রাথমিক ব্যয় (২০১৮): ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। সম্ভাব্য নতুন ব্যয়: সাড়ে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা। ব্যয় বৃদ্ধি: প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনের প্রাথমিক হিসাবেও ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা করা হয়েছে।
এই বিশাল অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় কেন হচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন তীব্র।
সমালোচকরা বলছেন,
সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে না পারা এবং সময়মতো ভূমি অধিগ্রহণ (যা প্রকল্পের অনুমোদনের আট বছর পর, গত ১৬ জুন করা হয়) করতে না পারার দায় দেশের জনগণকে নিতে হচ্ছে।
অদক্ষতা ও লুটপাটের প্রশ্ন: কার পকেটে যাচ্ছে ৫ হাজার কোটি?
এই প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা শুধুমাত্র ডলারের মূল্যবৃদ্ধির ফল হিসেবে দেখতে নারাজ।
তাদের মতে, এটি ইউনুস সরকারের চরম অদক্ষতা এবং অব্যবস্থাপনার প্রমাণ।
- সিদ্ধান্তহীনতার দায়: ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অর্থায়নে অনাগ্রহ প্রকাশের পর বিকল্প অর্থায়নের প্রক্রিয়া শুরু করতে যে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ হয়েছে, তার ফলস্বরূপ আজ এই বিশাল অঙ্কের ব্যয় বাড়ছে।
- ডিপিপি সংশোধন: কর্মকর্তারা বলছেন, এখন ডিটেইলড ডিজাইনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ব্যয় নির্ধারণ করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধির জন্য বাফার যুক্ত করতে হচ্ছে। এই বাফার যুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়েই সন্দেহের অবকাশ থাকে। জনগণের অর্থ কেন অদক্ষতার কারণে এত বড় ‘বাফার’-এর বোঝা বহন করবে?
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক শামছুল হক যথার্থই বলেছেন, প্রকল্পটি আগে যে ব্যয়ে বাস্তবসম্মত ছিল,
এখন দ্বিগুণ ব্যয়ে সেটি আবারও ফিজিবল কি না, তা নতুন করে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের সুবিধা ও বর্তমান অবস্থা
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার সঙ্গে বগুড়ার রেল দূরত্ব প্রায় ১১২ কিলোমিটার কমবে, এবং বগুড়া-ঢাকা যাতায়াতের সময় সাশ্রয় হবে প্রায় তিন ঘণ্টা।
- দৈর্ঘ্য: ৮৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার মূল লাইনের সঙ্গে ৩৭ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার লুপ লাইন।
- অবকাঠামো: করতোয়া ও ইছামতী নদীর ওপর দুটি বড় সেতু, ২৫টি রেলসেতু, ৯১টি আরসিসি বক্স কালভার্ট এবং ৮টি নতুন স্টেশন নির্মিত হবে।
- সময়সীমা: ২০১৮ সালে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০২৩ সালের জুন।
- এখন তা পিছিয়ে ২০৩০ সালের দিকে শেষ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম জানিয়েছেন,
এআইআইবির অর্থায়নে সম্মতি দেওয়া হয়েছে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই প্রকল্পের প্রভাব
ভারতের সরে যাওয়া এবং চীনের এআইআইবির অর্থায়ন গ্রহণ করা একটি কৌশলগত পরিবর্তন নির্দেশ করে।
এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে বর্তমানে ভারতের ‘লাইন অব ক্রেডিট’-এর চেয়ে চীনের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব বাড়ছে।
যদিও এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সরাসরি কোনো বিশ্লেষণী প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি,
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার পরিবর্তন এবং চীনের ক্রমবর্ধমান আর্থিক উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার নজর এড়ায়নি।
এই ৫ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ভার শেষ পর্যন্ত দেশের জনগণের কাঁধেই চাপবে।
তাই, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত এই ডিপিপি সংশোধনী প্রক্রিয়াকে সর্বাধিক স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন করা
এবং এই দীর্ঘসূত্রিতার জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
