সুদানের আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘের ইউনিসফা মিশনের ঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় ৬ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত ও ৮ জন আহত। উদ্বেগ ও প্রশ্ন আন্তর্জাতিক মহলে।
সুদানের আবেই অঞ্চলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিসফা (UNISFA)–এর একটি ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬ জন শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও অন্তত ৮ জন শান্তিরক্ষী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে নারী সেনাসদস্যও রয়েছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তীব্র সংঘর্ষ, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বচ্ছ নয়
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শান্তিরক্ষীদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের তীব্র সংঘর্ষ হয়েছে। হামলার সময় ইউনিসফা ঘাঁটিটি সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
আইএসপিআর জানায়, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত সংঘর্ষ পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় নিহত ও আহত শান্তিরক্ষীদের নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। আইএসপিআর কিংবা অন্য কোনো সরকারি সূত্র থেকেও নিহতদের পরিচয় প্রকাশ সংক্রান্ত কোনো ঘোষণা আসেনি।
জাতিসংঘের নীরবতা ঘিরে প্রশ্ন
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জাতিসংঘ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে এই হামলার ঘটনা প্রকাশ করেনি।
ইউনিসফার ওয়েবসাইট বা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বিভাগের (DPKO) কোনো অফিসিয়াল বিবৃতিতেও এখন পর্যন্ত হামলার বিষয়টি উঠে আসেনি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর ওপর সরাসরি হামলার ঘটনা সাধারণত দ্রুত বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সংস্থাটির নীরবতা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রয়টার্স, বিবিসি, আল জাজিরা কিংবা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও পৃথকভাবে খবরটি প্রকাশিত হয়নি।
সরকারের নিন্দা, তবে ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা
বাংলাদেশ সরকার ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এই হামলার তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।
নিহত শান্তিরক্ষীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হয়েছে।
তবে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের একাংশের মতে, “জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের ওপর এমন গুরুতর হামলার ঘটনায় সরকারের প্রতিক্রিয়া আরও জোরালো ও কূটনৈতিকভাবে দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন ছিল।”
তাদের দাবি, জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ, নিরাপত্তা জোরদার দাবি এবং আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান আরও স্পষ্টভাবে আসা উচিত ছিল।
বাংলাদেশ ও শান্তিরক্ষা মিশনের বাস্তবতা
বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেনা ও পুলিশ সদস্য প্রেরণকারী দেশ।
আফ্রিকার বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন এবং বহুবার জীবন উৎসর্গ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনা নয়, বরং সুদানে চলমান অস্থিরতা, মিলিশিয়া তৎপরতা এবং শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন।
আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন
এই হামলার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—
- শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ কতটা কার্যকর?
- ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালনের সময় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সমন্বয় যথেষ্ট কি না?
- বাংলাদেশ কি এই ঘটনার আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
উপসংহার
সুদানের আবেই অঞ্চলে ইউনিসফা ঘাঁটিতে হামলায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের প্রাণহানি জাতির জন্য গভীর শোকের ও উদ্বেগের বিষয়।
একই সঙ্গে এটি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতা নিয়েও নতুন করে আলোচনার দরজা খুলে দিয়েছে।
নিহত শান্তিরক্ষীদের আত্মার শান্তি কামনা এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য প্রত্যাশা করছে দেশবাসী।
