নির্বাচনের আগে জামায়াত সহ ইসলামপন্থীদের সঙ্গে মার্কিন বৈঠক ঘিরে বাংলাদেশে উগ্রবাদ প্রতিষ্ঠায় পশ্চিমা মদদের অভিযোগ জোরালো হচ্ছে।
নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশে ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কূটনীতিকদের ধারাবাহিক বৈঠক নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আঞ্চলিক ও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এবং উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলোকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—এগুলো কি কেবল ‘রাজনৈতিক সংলাপ’, নাকি উগ্রবাদী শক্তিকে মূলধারায় আনার কৌশল?
সিলেট থেকে ঢাকা: ধারাবাহিক যোগাযোগ
এই সপ্তাহে সিলেটে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের আঞ্চলিক কার্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মকর্তাদের বৈঠক ছিল সাম্প্রতিকতম ঘটনা। এর আগে ২০২৪ ও ২০২৫ জুড়ে ঢাকায় আমেরিকান ক্লাব, জামায়াতের সদর দপ্তর এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ফোরামে একাধিক বৈঠকের তথ্য সামনে আসে। ২০২৫ সালের মার্চে দুই সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতের জামায়াত সদর দপ্তর পরিদর্শন, জুনে ‘প্রতিনিধি দল’ আমন্ত্রণ এবং জুলাইয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসনের আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ—সব মিলিয়ে যোগাযোগের পরিসর স্পষ্টতই বিস্তৃত।
জামায়াতের অতীত ও সহিংসতার অভিযোগ
সমালোচকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যা ও ধর্ষণে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগীদের ভূমিকার অভিযোগ আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত। পরবর্তী দশকগুলোতে ধর্মভিত্তিক সহিংসতা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন ও উসকানিমূলক রাজনীতির সঙ্গেও সংগঠনটির নাম জড়িয়েছে। ২০১৪ সালে জেনস টেররিজম অ্যান্ড ইনসারজেন্সি সেন্টার ইসলামী ছাত্রশিবিরকে বিশ্বের অন্যতম সহিংস বেসরকারি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করে। অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা সরকারের প্রতিবেদনেও নির্বাচনী সহিংসতা, পেট্রোল বোমা হামলা ও সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের উল্লেখ রয়েছে।
পশ্চিমা থিঙ্কট্যাঙ্ক ও আধা-সরকারি সংস্থার ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্র-অর্থায়িত ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI) ও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (NDI) বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ে সক্রিয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এসব সংস্থার প্রতিনিধিরা জামায়াত, বিএনপি এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন। আইআরআই–এনডিআই উভয়ই ন্যাশনাল এনডাওমেন্ট ফর ডেমোক্রেসির অর্থায়নে পরিচালিত—যা তাদের কার্যক্রমকে ‘আধা-সরকারি’ মাত্রা দেয়।
ইসলামপন্থী জোট ও নির্বাচনী অঙ্ক
জরিপে ইসলামপন্থী দল ও তাদের মিত্রদের শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত মিলছে—এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ক্ষমতার সমীকরণ বদলালে বাংলাদেশ আরও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে যেতে পারে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শরিয়াহ আইন চালুর ঘোষণা এবং আফগানিস্তান মডেলের বক্তব্য এই উদ্বেগ বাড়িয়েছে। জামায়াতকেন্দ্রিক জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনাও আলোচনায়।
বিতর্কিত বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
জামায়াতের শীর্ষ নেতা শফিকুর রহমানের ইহুদিবিরোধী মন্তব্য ও হামাস নেতাদের প্রশংসা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। তবুও ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাকে যুক্তরাষ্ট্র ভিসা দেওয়ার খবর সমালোচনার জন্ম দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি নিউইয়র্ক, বাফেলো, মিশিগান ও ওয়াশিংটন ডিসিতে বিভিন্ন বৈঠক করেন।
অন্তর্বর্তী সরকার ও মানবাধিকার প্রশ্ন
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ইসলামপন্থী গোষ্ঠীগুলো মূলধারায় জায়গা পাচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ধর্ম অবমাননা আইন জোরদারের দাবি এবং সাংবাদিক গ্রেপ্তারের ঘটনা মানবাধিকার প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
সাংবাদিক শাহরিয়ার কবিরের গ্রেপ্তার নিয়ে সরকারিভাবে যে ভাষ্য দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের ইঙ্গিত
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বিএনপি ও জামায়াতের কিছু সদস্য-সমর্থকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি হলে জঙ্গিবাদী তৎপরতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
অতীতের শিক্ষা ও বর্তমান ঝুঁকি
মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্ত পরবর্তী সময়ে মুসলিম ব্রাদারহুডকে গ্রহণ করার পশ্চিমা সিদ্ধান্তের পরিণতি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
গবেষকরা সতর্ক করছেন—‘সংযত ইসলামপন্থী’ ধারণা বারবার ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশে একই পথে হাঁটলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শেষ কথা
নির্বাচনের আগে জামায়াতসহ ইসলামপন্থীদের সঙ্গে পশ্চিমা যোগাযোগ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে।
এটি কৌশলগত সংলাপ না উগ্রবাদকে বৈধতা—এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।
তবে মানবাধিকার, সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও সহিংসতা প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের অবস্থান স্পষ্ট না হলে ঝুঁকি বাড়বে—এমনটাই মত বিশ্লেষকদের।
