বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক সায়মা ওয়াজেদকে পুনর্বহালে সক্রিয় ভারতসহ ৬ দেশ। সিদ্ধান্ত আসতে পারে আগামী সপ্তাহেই।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক পদে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলকে পুনরায় বহাল করার উদ্যোগ জোরালোভাবে এগোচ্ছে। এই উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারতের মতো প্রভাবশালী সদস্য দেশ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
ডব্লিউএইচও-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সদর দফতর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থিত। ফলে আঞ্চলিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক প্রভাব এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ছয় সদস্য দেশের সমর্থন, বাংলাদেশের আপত্তি একঘরে
ডব্লিউএইচও-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ১০টি সদস্য দেশের মধ্যে অন্তত ছয়টি দেশ প্রকাশ্যে ও আনুষ্ঠানিকভাবে সায়মা ওয়াজেদের পুনর্বহালের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
এসব দেশের যুক্তি হলো—
একটি মাত্র সদস্য দেশের (বাংলাদেশ) আপত্তির কারণে একজন নির্বাচিত পূর্ণকালীন আঞ্চলিক পরিচালককে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানো ডব্লিউএইচও-এর নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সমর্থনকারী দেশগুলো আরও বলছে, সায়মা ওয়াজেদ বর্তমানে ছুটিতে থাকলেও পূর্ণ বেতন ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন, অথচ কার্যত দায়িত্ব পালন করছেন না।
এতে জাতিসংঘের একটি সংস্থার অযৌক্তিক ব্যয় বাড়ছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
মহাপরিচালকের দিল্লি সফরেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত?
আগামী ১৭ থেকে ১৯ ডিসেম্বর ডব্লিউএইচও-এর মহাপরিচালক ড. তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস দিল্লি সফরে আসছেন।
তিনি সেখানে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন বিষয়ক দ্বিতীয় গ্লোবাল সামিটে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সংস্থার নতুন কার্যালয় ভবন উদ্বোধন করবেন।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, এই সফরেই সায়মা ওয়াজেদের পুনর্বহাল নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা হতে পারে।
ভারতসহ সমর্থনকারী দেশগুলোর চাপ রয়েছে—মহাপরিচালকের উপস্থিতিতেই তাকে পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়া হোক।
ছুটিতে যাওয়ার পেছনের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ডব্লিউএইচও-এর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
তার মেয়াদ নির্ধারিত রয়েছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত।
তবে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আপত্তির মুখে গত ১১ জুলাই তাকে অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে পাঠানো হয়।
এ সিদ্ধান্তের পেছনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা দুর্নীতি, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে দায়ের করা দুটি মামলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হয়।
ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ও ওয়েবসাইট বিতর্ক
সায়মা ওয়াজেদের অনুপস্থিতিতে বর্তমানে ক্যাথরিনা বোয়েহমি ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
জুলাইয়ে ছুটিতে পাঠানোর পর ডব্লিউএইচও-এর ওয়েবসাইট থেকে তার নাম ও ছবি সরিয়ে নেওয়া হলেও সদস্য দেশগুলোর চাপের মুখে পরে তা পুনরায় যুক্ত করা হয়।
বর্তমানে সায়মা ওয়াজেদ দিল্লিতেই অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান এখনো অনড়
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডব্লিউএইচও থেকে পুনর্বহাল সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা এখনো পাওয়া যায়নি।
এর আগে দুদকের চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডব্লিউএইচও-তে পাঠানো হয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে সরকারিভাবে এখনো কোনো মন্তব্য আসেনি।
আন্তর্জাতিক কভারেজ
এই ইস্যুটি এখনো রয়টার্স, এপি বা বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পৃথকভাবে প্রকাশিত হয়নি। তবে দিল্লিকেন্দ্রিক কূটনৈতিক মহলে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
উপসংহার
সায়মা ওয়াজেদের পুনর্বহাল শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং ডব্লিউএইচও-এর অভ্যন্তরীণ শাসন কাঠামোর ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
আগামী সপ্তাহে দিল্লিতে নেওয়া সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহল।
