দেড় বছরে অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে বাড়ছে জনঅসন্তোষ; আগের সরকারের সঙ্গে তুলনাও সামনে আসছে।
গত দেড় বছরে সরকার নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যায়নি—এমন অভিযোগ এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। অর্থনীতি থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা, গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নির্বাচন—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতেই সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সমস্যার গভীরতা স্বীকার না করে পরিস্থিতিকে ‘স্বাভাবিক’ দেখানোর প্রবণতাই এই ব্যর্থতাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। এর ফল হিসেবে জনমনে অসন্তোষ বাড়ছে এবং অনেকেই প্রকাশ্যে বলছেন—আগের সরকার, বিশেষ করে শেখ হাসিনার সময়ের শাসনব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল ছিল।
অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার ব্যয়
গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি ভুগেছে সাধারণ মানুষ—জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
নিত্যপণ্যের দাম কমার আশ্বাস বারবার এলেও বাস্তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে জ্বালানি—সবকিছুর দামই সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত নীতি, শক্ত বাজার তদারকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ঘাটতি স্পষ্ট ছিল।
মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর কোনো নিরাপত্তা বলয় গড়ে ওঠেনি।
আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা: সরকারি দাবি বনাম বাস্তবতা
সরকার দাবি করছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে, কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
গত দেড় বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা, খুন, হামলা, গুলি ও গ্রেপ্তারের ঘটনা জনমনে গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে।
বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্মী, সাংবাদিক ও মতপ্রকাশে সক্রিয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—
➡️ আইনের প্রয়োগ কি সবার জন্য সমান?
➡️ ভিন্নমত প্রকাশ করলেই কি আইনি ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে?
এই বাস্তবতায় অনেক নাগরিক বলছেন, আগের সরকারের আমলে অন্তত আইনশৃঙ্খলার ধারাবাহিকতা বেশি ছিল।
মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত
গত দেড় বছরে সরকারের সবচেয়ে সমালোচিত দিকগুলোর একটি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।
সাংবাদিক, লেখক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের প্রয়োগ নিয়ে দেশ-বিদেশে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সমালোচনাকে দমন করার এই প্রবণতা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে এবং সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে।
নির্বাচন ও গণতন্ত্র প্রশ্নের মুখে
নির্বাচন কমিশন ‘ফ্রি ও ফেয়ার’ নির্বাচনের আশ্বাস দিলেও মাঠের বাস্তবতা নিয়ে সংশয় কাটেনি।
নির্বাচনের আগে সহিংসতা, বিরোধী কণ্ঠের ওপর চাপ এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকার প্রয়োজনীয় আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
এর ফলেই জনগণের একটি অংশ আগের সরকারের সময়ের নির্বাচনী কাঠামোর সঙ্গে তুলনা টানছে।
তরুণদের হতাশা ও কর্মসংস্থান সংকট
সরকার বারবার তরুণদের শক্তির কথা বললেও বাস্তবে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়েনি।
বেকারত্ব, চাকরিতে বয়সসীমা, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম ও স্বচ্ছতার অভাব তরুণ সমাজকে হতাশ করছে।
এক দেড় বছরে এই সংকট নিরসনে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় তরুণদের মধ্যেও সরকারের প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে।
জবাবদিহির অভাবই মূল সংকট
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো জবাবদিহির অভাব।
ভুল সিদ্ধান্ত, ব্যর্থ নীতি বা জনঅসন্তোষের বিষয়ে দায় স্বীকারের পরিবর্তে পরিস্থিতি অস্বীকার করার প্রবণতা সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।
এ কারণেই অনেক নাগরিক বলছেন—আগের সরকারের সময়ে অন্তত শাসন কাঠামোতে ধারাবাহিকতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়তা ছিল।
শেষ কথা
গত দেড় বছরে সরকারের ব্যর্থতা কোনো একক খাতে সীমাবদ্ধ নয়—এটি একটি সামগ্রিক শাসন সংকটের প্রতিফলন।
অর্থনীতি, নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশ—সব ক্ষেত্রেই আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট।
এই বাস্তবতায় জনমনে আগের সরকারের সঙ্গে তুলনা আসছে, যা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।
সময় থাকতেই যদি সরকার বাস্তবতা স্বীকার করে কার্যকর সংস্কারের পথে না যায়,
তাহলে এই অসন্তোষ ভবিষ্যতে আরও গভীর রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
