জঙ্গী সহিংসতা ও নিরাপত্তাহীনতায় ক্ষুব্ধ জনগণ তাত্ত্বিক গণতন্ত্র নয়, স্থিতিশীলতা চায়। সেনা শাসনের দাবি কেন উঠছে ?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে সাম্প্রতিক সময়ে একটি শব্দ নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে—সেনা শাসন। বিষয়টি অনেকের কাছে অস্বস্তিকর, অনেকের কাছে আতঙ্কজনক হলেও বাস্তবতা হলো, এই দাবি হঠাৎ করে জন্ম নেয়নি। জঙ্গী সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, নির্বিচার হত্যা ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ধারাবাহিক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারা এখন শাসনের ধরন নয়—শাসনের সক্ষমতা খুঁজছে।
জঙ্গী সহিংসতা ও রাষ্ট্রের নীরবতা
সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকায় জঙ্গী তৎপরতা, সহিংস ভিডিও ফুটেজ এবং প্রকাশ্য তাণ্ডব জনমনে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। অভিযোগ উঠছে—রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া দুর্বল, ধীর এবং অনেক ক্ষেত্রে অস্পষ্ট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, বিচার প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যখন সহিংসতা নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয় এবং রাষ্ট্র কার্যত প্রতিরোধে ব্যর্থ বলে প্রতীয়মান হয়, তখন জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
ইউনুস সরকারের ওপর আস্থার সংকট
বর্তমান ইউনুস নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ—নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা। সরকার জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে না—এমন ধারণা সমাজের একটি বড় অংশে তৈরি হয়েছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রক্ষা, সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা প্রশ্নের মুখে।
এই আস্থাহীনতার ফলেই রাজনৈতিক বিতর্কে ঢুকে পড়েছে সেনা শাসনের প্রসঙ্গ।
সেনাবাহিনী কেন বিকল্প হিসেবে আলোচনায়
বাংলাদেশে সেনাবাহিনী এখনো শৃঙ্খলা, সংগঠন ও দ্রুত সিদ্ধান্তের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। ইতিহাসে দেখা গেছে, দুর্যোগ, সংকট বা বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জে সেনাবাহিনীর ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কার্যকর ছিল। ফলে সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করছে—
- সেনা শাসনে রাস্তায় আগুন থাকবে না
- প্রকাশ্য জঙ্গী তাণ্ডব কমবে
- সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ঠেকানো সম্ভব হবে
এই ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত—তা বিতর্কের বিষয়। কিন্তু এই ধারণার জন্ম নেওয়াটাই রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা।
ইতিহাস কী বলে
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন—কোনো জাতি স্বেচ্ছায় সেনা শাসন চায় না। ইতিহাস বলে, নির্বাচিত সরকার যখন নাগরিকের জীবন, নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখনই মানুষ কঠোর শাসনের কথা ভাবতে শুরু করে।
এই প্রেক্ষাপটে সেনা শাসনের দাবি গণতন্ত্রবিরোধী আবেগ নয়; বরং এটি ব্যর্থ শাসনের বিরুদ্ধে জনমনের প্রতিবাদ।
মূল প্রশ্ন কোথায়
প্রশ্নটি সেনা শাসন ভালো না মন্দ—এখানে সীমাবদ্ধ নয়।
প্রশ্ন হলো—
- কেন জনগণ এমন বিকল্প ভাবতে বাধ্য হচ্ছে?
- কেন নির্বাচিত সরকার জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না?
এর উত্তর না খুঁজলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।
শেষ সতর্কবার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, সেনা শাসনের দাবি আসলে একটি শেষ অ্যালার্ম।
সরকার যদি এখনো সময় থাকতে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান না নেয়,
আইনের শাসন দৃশ্যমানভাবে প্রতিষ্ঠা না করে এবং জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়—তবে এই দাবি আরও বিস্তৃত হবে।
রাষ্ট্র যখন মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, মানুষ তখন শাসনের আদর্শ নয়—শাসনের শক্তি খুঁজতে শুরু করে।
