গত দেড় বছরে হাদী, ওয়াসিকুর বাবু, দিপু দাসসহ হাজারো মানুষের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এসব মৃত্যুর দায় রাষ্ট্র, এই মৃত্যুর দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে?

দেড় বছরে মৃত্যুর দীর্ঘ তালিকা
গত দেড় বছরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, গ্রেপ্তারকালীন মৃত্যু, কারা হেফাজতে মৃত্যু, পুলিশি হেফাজতে অসুস্থতা এবং চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর ঘটনা ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। হাদী, ওয়াসিকুর রহমান বাবু, দিপু দাস—এমন আরও অসংখ্য নাম আজ শুধু পরিসংখ্যান হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই মৃত্যুর দায় শেষ পর্যন্ত কে নেবে?

মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের মতে, এসব মৃত্যুর পেছনে কেবল ব্যক্তিগত অসুস্থতা নয়, বরং একটি বৃহত্তর কাঠামোগত ব্যর্থতা কাজ করছে।
আলোচিত কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা
সম্প্রতি কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রিমান্ডে হস্তান্তরের সময় আওয়ামী লীগ নেতা ওয়াসিকুর রহমান বাবু অসুস্থ হয়ে মারা যান। এর আগে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কর্মী হাদী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি দিপু দাসসহ আরও অনেকে গ্রেপ্তার, হেফাজত বা সহিংস পরিস্থিতিতে প্রাণ হারিয়েছেন।
প্রতিটি ঘটনার পর প্রশাসনের ভাষ্য প্রায় একই—
“অসুস্থতা”, “হৃদরোগ”, “স্বাভাবিক মৃত্যু”।
কিন্তু পরিবারের দাবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন ছবি তুলে ধরে।
কারা হেফাজত ও রিমান্ডে মৃত্যু: প্রশ্নের মুখে রাষ্ট্র
আইন অনুযায়ী, হেফাজতে থাকা একজন নাগরিকের জীবনের সম্পূর্ণ দায় রাষ্ট্রের। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জীবনের অধিকার মৌলিক অধিকার।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—
- গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির স্বাস্থ্য পরীক্ষা যথাযথভাবে হচ্ছে না
- রিমান্ড চলাকালে চিকিৎসা সুবিধা সীমিত
- অসুস্থতার অভিযোগ গুরুত্ব পাচ্ছে না
ফলে মৃত্যুর পর তদন্ত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দায় নির্ধারণ হয় না।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উদ্বেগ
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার এসব মৃত্যুর স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে—
- বিচারহীনতার সংস্কৃতি এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে
- প্রশাসনিক তদন্তে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে
- ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার পাচ্ছে না
একটি মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,
“হেফাজতে মৃত্যুর প্রতিটি ঘটনাই রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন তোলে।”
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গ্রেপ্তার ও মামলার সংখ্যা বেড়েছে। বিরোধী দল, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল কিংবা আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
- ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি অপরিবর্তিত
- তদন্ত কমিটি গঠন হলেও কার্যকর শাস্তি নেই
- ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থা কমছে
পরিবারগুলোর অপেক্ষা: ন্যায়বিচারের আশায়
হাদী, বাবু বা দিপু দাস—প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে আছে একটি পরিবার, যারা আজও অপেক্ষায়। অনেক পরিবার মামলা করলেও বছরের পর বছর ধরে তা ঝুলে থাকে।
এক ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য বলেন,
“আমরা প্রতিশোধ চাই না, সত্য জানতে চাই। দায়ীদের শাস্তি চাই।”
দায় কার: রাষ্ট্র, প্রশাসন না কি ব্যবস্থা?
এই প্রশ্নের উত্তর একক নয়। বিশ্লেষকদের মতে দায় রয়েছে—
- রাষ্ট্রের: নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ
- প্রশাসনের: যথাযথ তদারকি ও চিকিৎসা না দেওয়ার কারণে
- ব্যবস্থার: জবাবদিহির অভাব ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির জন্য
যতদিন পর্যন্ত স্বাধীন তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হবে, ততদিন এই মৃত্যুর মিছিল থামবে না।
দেড় বছরে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু কেবল সংখ্যার হিসাব নয়—এটি রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। হাদী, ওয়াসিকুর বাবু, দিপু দাসদের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি প্রশ্নই রেখে যায়—
এই দায় কি কেউ কখনো নেবে?
