আইএসআইয়ের তত্ত্বাবধানে এনএআর গঠনের অভিযোগ, ৮ হাজার সশস্ত্র শিবির সদস্য ও মাদ্রাসাভিত্তিক বোমা কারখানার তথ্য ঘিরে তীব্র উদ্বেগ
বাংলাদেশে সম্ভাব্য জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি নতুন সশস্ত্র কাঠামো—ন্যাশনাল আর্মড রিজার্ভ (এনএআর)—গঠনের উদ্যোগ ঘিরে দেশজুড়ে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, এই উদ্যোগ কোনো সাধারণ নিরাপত্তা সংস্কার নয়; বরং পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ও সে দেশের সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে একটি উগ্রপন্থী রাষ্ট্রে রূপান্তরের গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।
কী এই ন্যাশনাল আর্মড রিজার্ভ (এনএআর)?
গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এনএআর ইউনিটে অন্তত ৮ হাজার উগ্রপন্থায় প্রভাবিত তরুণকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বাহিনীর মূল লক্ষ্য হবে শরিয়াহ আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করা। ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর কর্মকর্তারা বলছেন, এনএআর কার্যত পুলিশের বিকল্প শক্তি হিসেবে কাজ করবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে কট্টর ধর্মীয় বিধান চাপিয়ে দেবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি “ছায়া বাহিনী”, যা সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করবে।
আইএসআই ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভূমিকা
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এনএআর গঠনের নেপথ্যে রয়েছে পাকিস্তানের আইএসআই ও সে দেশের সামরিক নেতৃত্ব। পরিকল্পনা অনুযায়ী, একদিকে থাকবে একটি কট্টরপন্থী সশস্ত্র বাহিনী, অন্যদিকে একটি পুলিশি কাঠামো—দুটিই পাকিস্তানপন্থী শক্তির নিয়ন্ত্রণে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশে এমন ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হচ্ছে, যারা পাকিস্তানমুখী এবং চরম উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী। এই নেটওয়ার্ক গঠনের জন্য একাধিক গোপন বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজমি ফ্যাক্টর: গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ছক
এই পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার আব্দুল্লাহিল আমান আজমি। তিনি প্রয়াত জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আজমের পুত্র এবং দীর্ঘদিন ধরে কট্টরপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তান প্রথমে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে বসাতে চায়।
নির্বাচন সম্পন্ন হলে সেই পদ বিলুপ্ত করে তাকে এনএআরের শীর্ষ দায়িত্বে বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা–ইসলামাবাদ যোগাযোগ ও গোপন বৈঠক
মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একাধিক পাকিস্তানি কূটনীতিক বাংলাদেশ সফর করেছেন।
তারা নিয়মিতভাবে ঢাকার কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করছেন। এসব বৈঠকের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আজমির নাম উঠে এসেছে।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বনানী অফিসার্স হাউজিং স্কিমে অবস্থিত একটি কমপ্লেক্সে এসব বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
২৩ ডিসেম্বর আজমি ও পাকিস্তানের ডেপুটি হাই কমিশনার মোহাম্মদ ওয়াসিমের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠক ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নজরে এসেছে, যা “বড় কিছুর ইঙ্গিত” বহন করে।
নির্বাচন বানচালের আশঙ্কা ও ‘পাকিস্তান মডেল’
নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রস্তাবিত ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালের নির্বাচন আন্তর্জাতিক চাপের কারণে আয়োজন করা হতে পারে।
তবে প্রকৃত ক্ষমতা থাকবে এনএআর ও পাকিস্তানপন্থী সামরিক কাঠামোর হাতে—যেমনটি পাকিস্তানে দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি “পাকিস্তান মডেল”—নামেমাত্র গণতান্ত্রিক সরকার, বাস্তবে সেনাবাহিনীর শাসন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ছক বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ।
চূড়ান্ত লক্ষ্য: উগ্রপন্থী রাষ্ট্র?
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, এনএআর গঠনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ উগ্রপন্থী রাষ্ট্রে পরিণত করা।
আইএসআই-সমর্থিত জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনগুলো এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
মাদ্রাসাভিত্তিক বিস্ফোরক প্রস্তুতকরণ ও সশস্ত্র শিবির সদস্যদের ব্যবহার করে একটি ভয়ংকর কাঠামো গড়ে তোলার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সার-কথা
এনএআর গঠন যদি সত্যিই আইএসআইয়ের ছায়া পরিকল্পনার অংশ হয়ে থাকে, তবে তা শুধু বাংলাদেশের গণতন্ত্র নয়, আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ধরনের সশস্ত্র কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রশ্ন তুলছে—
এটি কি আদর্শ ও অভূতপূর্ব নির্বাচনী প্রস্তুতি, নাকি একটি রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণের ভয়ংকর ষড়যন্ত্র?
