রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াত আমীর শফিকুর রহমান ঐক্য সরকার, দুর্নীতিবিরোধী এজেন্ডা ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন পর একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে ইসলামপন্থী দল জামায়াত-ই-ইসলামীর সাম্প্রতিক অবস্থান। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে দলটির আমীর শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর একটি ঐক্য সরকারে যোগ দিতে আগ্রহী জামায়াত। এই বক্তব্য শুধু নির্বাচনী কৌশল নয়, বরং বাংলাদেশি রাজনীতির ভবিষ্যৎ বিন্যাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।
দীর্ঘ বিরতির পর মূলধারায় প্রত্যাবর্তন
২০১৩ সাল থেকে নিষিদ্ধ থাকা জামায়াত-ই-ইসলামী প্রায় ১৭ বছর পর আবার জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে। আদালতের রায়ের মাধ্যমে দলটির নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াত কার্যত রাজনীতির বাইরে চলে যায়। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে জামায়াত নতুন করে রাজনীতির মাঠে ফেরার সুযোগ পায়।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মতামত জরিপগুলোতে জামায়াতকে বিএনপির খুব কাছাকাছি দ্বিতীয় অবস্থানে দেখা যাচ্ছে। এটি জামায়াতের জন্য শুধু রাজনৈতিক সাফল্য নয়, বরং দীর্ঘ নির্বাসনের পর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পাওয়ার একটি ইঙ্গিত।
ঐক্য সরকারের ধারণা: কেন এখন?
শফিকুর রহমান সাক্ষাৎকারে বলেন,
“আমরা অন্তত পাঁচ বছরের জন্য একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র দেখতে চাই।”
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন, জামায়াত একক ক্ষমতার পরিবর্তে সমঝোতা ও অংশীদারিত্বের রাজনীতির দিকে ঝুঁকছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও প্রশাসনিক সংকটের পর জনগণের মধ্যে একটি স্থিতিশীল সরকার দেখার আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে। জামায়াত এই মনোভাবকে রাজনৈতিক মূলধনে পরিণত করতে চাইছে।
দুর্নীতিবিরোধী এজেন্ডা: নতুন রাজনৈতিক ভাষা?
জামায়াত ঐতিহ্যগতভাবে শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী শাসনের কথা বললেও, এবার দলটি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে যৌথ এজেন্ডা হিসেবে তুলে ধরছে। শফিকুর রহমান বলেন, ঐক্য সরকার হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সম্মিলিত কর্মসূচি থাকতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি জামায়াতের কৌশলগত ভাষা পরিবর্তনের অংশ। তরুণ ভোটার ও নগর মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে দুর্নীতি এখন সবচেয়ে বড় ইস্যু। জামায়াত সেই জায়গায় নিজেদের অবস্থান জোরদার করতে চাইছে।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্নে সতর্কতা
জামায়াত সবচেয়ে বেশি আসন পেলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন—এই প্রশ্নে শফিকুর রহমান ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ না করে দলীয় সিদ্ধান্তের কথা বলেন। এটি জামায়াতের ভেতরে নেতৃত্বের বিষয়ে সমষ্টিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি বিএনপি ও অন্যান্য সম্ভাব্য মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার একটি কৌশলও হতে পারে, যাতে আগাম কোনো নেতৃত্বসংকট না তৈরি হয়।
বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক: পুরোনো জোটের নতুন রূপ?
জামায়াত সর্বশেষ ২০০১–২০০৬ মেয়াদে বিএনপির সঙ্গে জোট সরকারে জুনিয়র অংশীদার ছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আবারও বিএনপির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী বলে ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে নিষিদ্ধ, রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল এবং আন্তর্জাতিক নজর তীব্র।
ফলে জামায়াত-বিএনপি সম্পর্ক এবার শুধু ক্ষমতা ভাগাভাগি নয়, বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।
ভারত প্রসঙ্গ: খোলামেলা বার্তা
শফিকুর রহমানের বক্তব্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো ভারত নিয়ে তার মন্তব্য।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতি নিয়ে তিনি প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, এক ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল, কিন্তু সেটি গোপন রাখার অনুরোধ করা হয়।
এই বিষয়টি সামনে এনে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—কূটনৈতিক সম্পর্ক কেন স্বচ্ছ হবে না?
এটি জামায়াতের পক্ষ থেকে ভারতের প্রতি এক ধরনের বার্তা: ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তারা খোলা ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়।
পাকিস্তান প্রসঙ্গে অবস্থান
পাকিস্তানের সঙ্গে জামায়াতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক বরাবরই বিতর্কিত।
তবে শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমরা কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকতে চাই না।”
এই বক্তব্য জামায়াতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে পশ্চিমা ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হতে।
রাষ্ট্রপতি প্রশ্ন ও সাংবিধানিক সংকেত
জামায়াত অন্তর্ভুক্ত সরকার রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে স্বস্তিবোধ করবে না—এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি নিজেও প্রয়োজনে পদত্যাগের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা ভবিষ্যতে সাংবিধানিক পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা উন্মুক্ত করছে।
রাজনীতির নতুন সমীকরণ?
রয়টার্সকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকার স্পষ্ট করে দেয়—জামায়াত-ই-ইসলামী আর শুধু একটি প্রান্তিক ইসলামপন্থী দল হিসেবে থাকতে চায় না।
তারা নিজেদের সমঝোতাভিত্তিক, দুর্নীতিবিরোধী এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করছে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হতে যাচ্ছে, তাতে জামায়াতের এই অবস্থান বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশ্ন একটাই—বাংলাদেশের রাজনীতি কি সত্যিই একটি স্থিতিশীল ঐক্যের পথে হাঁটবে, নাকি পুরোনো দ্বন্দ্বই নতুন রূপে ফিরে আসবে?
