সন্ত্রাসবাদে প্রশ্রয় দিলে সুসম্পর্ক সম্ভব নয়—প্রতিবেশী দেশগুলিকে স্পষ্ট বার্তা দিলেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
ভারতের ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ বা ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া। চেন্নাইয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভারতের বিদেশমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর অত্যন্ত সরল ভাষায় এই নীতির মৌলিক দর্শন ব্যাখ্যা করে দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল স্পষ্ট—সুসম্পর্ক ও সন্ত্রাসবাদ একসঙ্গে চলতে পারে না।
তিনি বলেন, ভারত সবসময় প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত, তবে সেই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক আস্থা ও নিরাপত্তা।
কূটনীতি মানেই ‘ভদ্র ভাষায় সাধারণ জ্ঞান’
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে জয়শঙ্কর কূটনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেন—
“Diplomacy is common sense in polished language।”
তার ব্যাখ্যায়, যদি কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে বা অন্তত ক্ষতি না করে, তবে তাদের বিপদে সাহায্য করাই স্বাভাবিক। ভারত ঠিক সেটাই করে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
উদাহরণে ভারতের ভূমিকা: ভ্যাকসিন থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা
নিজের বক্তব্যকে জোরালো করতে বিদেশমন্ত্রী একাধিক বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন—
- কোভিড-১৯ মহামারিতে ‘ভ্যাকসিন মৈত্রী’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিবেশী দেশগুলিকে টিকা সরবরাহ
- ইউক্রেন যুদ্ধের সময় খাদ্য ও জ্বালানি সংকটে সহায়তা
- শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা
- ঘূর্ণিঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে দ্রুত উদ্ধারকারী দল পাঠানো
জয়শঙ্করের মতে, এসব উদাহরণ প্রমাণ করে যে সংকটকালে ভারতের ওপর প্রতিবেশী দেশগুলোর সাধারণ মানুষও আস্থা রাখতে পারে।
পাকিস্তান প্রসঙ্গ: নাম না করে কড়া সতর্কতা
পশ্চিমের প্রতিবেশী পাকিস্তানের নাম সরাসরি উল্লেখ না করলেও, বিদেশমন্ত্রীর বার্তা ছিল সুস্পষ্ট ও কঠোর। তিনি বলেন,
“যদি কোনো দেশ ইচ্ছাকৃতভাবে এবং ধারাবাহিকভাবে সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আমাদেরও নিজেদের রক্ষা করার অধিকার আছে।”
তিনি আরও স্পষ্ট করেন, ভারত সেই অধিকার প্রয়োগ করতেও পিছপা হবে না।
সিন্ধু জলচুক্তি: সম্পর্কের শর্ত স্পষ্ট
সিন্ধু জলচুক্তির প্রসঙ্গ টেনে জয়শঙ্কর একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইঙ্গিত দেন। তাঁর ভাষায়,
ভালো সম্পর্কের কারণেই অতীতে জলবণ্টনের মতো সংবেদনশীল চুক্তি সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু একদিকে সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়া আর অন্যদিকে জলবণ্টনের সুবিধা ভোগ করা—এই দুইটি বিষয় একসঙ্গে চলতে পারে না।
এই মন্তব্যকে অনেক বিশ্লেষক দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক অবস্থানের স্পষ্ট দিকনির্দেশনা হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: স্থিতিশীলতার প্রত্যাশা
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর বলেন, ভারত চায় তার অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল প্রতিবেশী দেশগুলিও উপভোগ করুক।
তিনি বলেন,
“আমরা বাংলাদেশের নির্বাচনের জন্য শুভকামনা জানাই এবং আশা করি পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে এই অঞ্চলে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে।”
এই বক্তব্যকে কূটনৈতিক ভাষায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপর ভারতের প্রত্যাশার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
‘লিফটিং টাইড’ তত্ত্ব: ভারতের উন্নতির আঞ্চলিক প্রভাব
বিদেশমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষাংশে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে একটি ‘লিফটিং টাইড’ বা জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর মতে, ভারতের প্রবৃদ্ধি এমন একটি ঢেউ, যার সুফল দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই পেতে পারে—শর্ত একটাই, সদিচ্ছা ও সহযোগিতা।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বিশ্লেষণ
জয়শঙ্করের এই বক্তব্য ভারতীয় সংবাদ সংস্থা ANI, PTI এবং একাধিক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক প্ল্যাটফর্মে গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য মূলত তিনটি বার্তা বহন করছে—
- প্রতিবেশীদের প্রতি ভারতের সহযোগিতার নীতি অপরিবর্তিত
- সন্ত্রাসবাদ প্রশ্নে কোনো আপস নয়
- আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়
উপসংহার
ড. এস জয়শঙ্করের বক্তব্য শুধু একটি কূটনৈতিক ভাষণ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা। ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতি ভারতের জন্য কেবল সৌজন্য নয়, বরং নিরাপত্তা ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার বিষয়—এই বার্তাই তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
সন্ত্রাসবাদ ও সুসম্পর্ক একসঙ্গে চলতে পারে না—এই এক বাক্যেই ভারত তার অবস্থান প্রতিবেশী দেশগুলোর সামনে পরিষ্কার করে দিয়েছে।
