যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও স্ত্রীর গ্রেপ্তার। আন্তর্জাতিক বিরোধ, আইনি প্রভাব ও সাদ্দাম-নরিয়েগা অভিযানের সাদৃশ্যে বিশ্লেষণ।
শনিবার (৩ জানুয়ারি) গভীর রাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ভেনেজুয়েলায় একটি বড় আকারের অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করেছে, এমন দাবि করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের বক্তব্যে বলা হয়েছে, অভিযানের মাধ্যমে মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়া হয়েছে।
পরবর্তীতে তাকে নতুন যোনোয়ার্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং সেখানকার আদালতে মাদক পাচার ও “নার্কো-টেররিজম” ইত্যাদি অভিযোগে বিচার করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এই ঘটনাকে অনেক বিশ্লেষক ১৯৮৯ সালের পানামের ম্যানুয়েল নরিয়েগা ও ২০০৩ সালের ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে আটক করার সঙ্গে তুলনা করেছেন,
যেখানে মার্কিন সরকার ঐ দুই নেতা-কে সন্ত্রাস, মাদক ও রাজনৈতিক কারণে ক্ষমতাচ্যুত করে যুক্তরাষ্ট্রে বিচার করেছিল।মাদুরোকে আটক করার প্রেক্ষাপট ও যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই মাদুরোকে অবৈধ সরকারী নেতা ও আন্তর্জাতিক মাদক চোরাকারবারির খাতিরে অস্তিত্বহীন সরকারী হিসেবেই স্বীকৃতি দেয়।
২০২৫ সালের শেষেও মাদুরো ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে “নার্কো-টেররিজম” ও ড্রাগ ট্রাফিকিং সংক্রান্ত ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল।
ট্রাম্প প্রশাসন সাংবাদিকদের জানান, এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল—
- মাদক পাচার ও অবৈধ অর্থনৈতিক চক্র ভাঙা,
- ভেনেজুয়েলার “অবৈধ নেতাকে” ধরিয়ে আদালতের মুখোমুখি করা,
- দেশটির রাজনৈতিক অস্থিতিশক্তি দূর করা।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে ধরিয়ে দিলে ৫০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করেছিল, যা তার বিশ্বব্যাপী মাদক চোরাচালান নেটওয়ার্কের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আইনি বিতর্ক
জাতিসংঘ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া
জাতিসংঘের মহাসচিবের অফিস জানিয়েছেন, মাদুরোর গ্রেপ্তার ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং অবিলম্বে তাকে মুক্তি দিতে চাপ দেওয়া উচিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠান নিন্দা
রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্সসহ বহু দেশ যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে স্বীকৃতিযোগ্য বলে না মেনে ভেনেজুয়েলার প্রতি সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবেও উল্লেখ করেছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক দাবি
ভেনেজুয়েলার সরকার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে জরুরি বৈঠক ডেকে আলোচনা করার জন্য আবেদন করেছে, যাতে এই ঘটনাকে রাজনৈতিক ও আইনি আলোকে পুনর্বিবেচনা করা যায়।
ইতিহাসে মার্কিন অভিযানের সাদৃশ্য
ম্যানুয়েল নরিয়েগা (পানামা)
১৯৮৯ সালে মার্কিন বাহিনী পানামায় অভিযান চালিয়ে ম্যানুয়েল নরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ধরে নিয়ে আসে; মাদক ও দুর্নীতির অভিযোগে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে বিচার করা হয়। পরবর্তীতে তাকে ফ্রান্সে প্রত্যর্পণ এবং আবার পানামায় ফিরিয়ে দেয়া হয়েছিল।
সাদ্দাম হোসেন (ইরাক)
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে সাদ্দাম হোসেনকে আটকে নেয়। পরে তিনি ইরাকি আদালতে বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ড পান।
মাদুরোর পরিস্থিতি
এবারের ঘটনাটিকে অনেক ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষক “নরিয়েগা ও সাদ্দামের মতোই” একটি সামরিক ও রাজনৈতিক অভিযানের অংশ বলে দাবি করছেন,
যেখানে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আরেকটি দেশের প্রধানকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে তোলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া
মাদুরোর শাসনামলের সমর্থকরা এই ঘটনাকে বিদেশী আগ্রাসন ও জাতীয় স্বাধীনতার প্রতি আঘাত হিসেবে বর্ণনা করছে। সরকারি পক্ষের দাবিতে,
এই পদক্ষেপ “ভেনেজুয়েলার জনগণের ইচ্ছার প্রতি অবজ্ঞা” রূপে দেখানো হচ্ছে এবং বিভিন্ন শহরে প্রতিবাদটি দৃশ্যমান।
অন্যদিকে কিছু বিরোধী গোষ্ঠী মনে করে, মাদক চোরাচালান ও দুর্নীতি নিয়ে মাদুরো সরকারের সময় ন্যায্য বিচার হওয়া উচিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে তারা ও সমালোচনার মাধ্যমে মূল্যায়ন করেছে।
শেষ কথা: ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক প্রভাব
এই ঘটনা কেবল ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যত নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, শক্তির ভারসাম্য, ও বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক খেলায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে—
বিশেষত যে ধরনের নীতিতে বড় শক্তিগুলি বিরোধী সরকারের প্রতি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে থাকে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশ্ন উঠছে।
