নিউইয়র্কের ফেডারেল আদালতে নিকোলাস মাদুরোর শুনানি ছিল উত্তেজনাপূর্ণ ও নাটকীয়। কী বললেন তিনি, কী ঘটল আদালত কক্ষে—
নিউইয়র্কের আদালতে শুরু ঐতিহাসিক শুনানি
স্থানীয় সময় সোমবার দুপুরে নিউইয়র্কের একটি ফেডারেল আদালতের ২৬ তলার কক্ষে শুরু হয় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার শুনানি। যুক্তরাষ্ট্রের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ডিইএ) দায়ের করা এই মামলাটি ঘিরে আদালত কক্ষে ছিল ব্যাপক কৌতূহল।
শুনানির সময় দর্শক গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন প্রায় ৫০ জন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক, সাধারণ দর্শক এবং ডিইএর কয়েকজন কর্মকর্তা।
প্রেসিডেন্ট থেকে আসামি
মাত্র তিন দিন আগেও কারাকাসে নিজের বিলাসবহুল প্রাসাদে সময় কাটানো মাদুরো এদিন আদালতে হাজির হন আসামি হিসেবে। তাঁর পরনে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের কয়েদিদের পরিচিত নীল ও কমলা রঙের পোশাক।
ইউএস মার্শালের দুজন সদস্য তাঁকে আদালত কক্ষে নিয়ে আসেন। প্রবেশ করেই মাদুরো কয়েকজনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকান এবং তিন-চারবার উচ্চস্বরে বলেন, “হ্যাপি নিউ ইয়ার”। তিনি পাশে থাকা ইউএস মার্শালের সদস্য ও নিজের আইনজীবীর সঙ্গে করমর্দনও করেন।
আদালত কক্ষে স্ত্রীর উপস্থিতি
মাদুরোর দুই আসন পেছনে বসেছিলেন তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস, যিনি এই মামলায় সহ-অভিযুক্ত। তাঁর ডান চোখের পাশে একটি ব্যান্ডেজ দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি সম্প্রতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন।
আদালত কক্ষের স্কেচে মাদুরো ও ফ্লোরেসকে পাশাপাশি বসে থাকতে দেখা যায়, যা সংবাদমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
‘আমি এখনও প্রেসিডেন্ট’—মাদুরোর দাবি
আদালতের সাধারণ গম্ভীর পরিবেশের বিপরীতে এই শুনানি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী।
বিচারক আনুষ্ঠানিকভাবে মাদুরোর পরিচয় জানতে চাইলে তিনি নিজের নাম বলার পরিবর্তে বলেন, তাঁকে ‘অপহরণ করে এখানে আনা হয়েছে’।
একপর্যায়ে বিচারক তাঁকে থামিয়ে কেবল নিজের নাম বলার নির্দেশ দেন। তবে মাদুরো বারবার নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং জোর দিয়ে বলেন,
“আমি এখনও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট।”
শুনানির পুরো সময় কথা বলার প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগাতে দেখা যায় তাঁকে।
শেষ মুহূর্তে উত্তেজনা
শুনানি শুরুর আগে আদালতের এক কর্মচারী দর্শকদের নীরব থাকার নির্দেশ দেন। কিন্তু শুনানির শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়।
ইউএস মার্শালরা যখন মাদুরোকে আদালত কক্ষ থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন গ্যালারিতে বসা এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়িয়ে স্প্যানিশ ভাষায় চিৎকার শুরু করেন।
মুহূর্তের মধ্যেই মাদুরোর সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। মাদুরো ওই ব্যক্তির দিকে স্থির ও কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন।
কে এই প্রতিবাদকারী?
পরে জানা যায়, ওই ব্যক্তির নাম পেদ্রো রোহাস (৩৩)। তিনি ২০১৯ সালে ভেনেজুয়েলা থেকে নির্বাসিত হন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে বসবাস করছেন। আদালতের বাইরে স্কাই নিউজকে রোহাস বলেন, “আমি চার মাস রাজনৈতিক বন্দি ছিলাম।
আমি মাদুরোকে আগেও বলেছি—তাঁকে এর মূল্য দিতে হবে। আজ তাই হলো।” তিনি আরও বলেন,
মাদুরো নিজেকে ‘ম্যান অব গড’ বললেও ভেনেজুয়েলার জনগণ কখনো গির্জায় হামলা চালায়নি—যা মাদুরোর বিরুদ্ধে তাঁর গুরুতর অভিযোগ।
পরবর্তী শুনানি মার্চে
শুনানি শেষে একটি মোটরকেডে করে মাদুরোকে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। আদালত সূত্র জানিয়েছে,
মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী মার্চ মাসে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শুনানি শুধু একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; বরং ভেনেজুয়েলার রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে।
