ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিতরা কাল শপথ নিচ্ছেন। তবে এমপি হিসেবে নয়, জুলাই সনদ অনুসারে তারা আগে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের সংসদ সদস্য বা এমপি হিসেবে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আগামীকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচিত সদস্যরা আইনসভার সদস্য হিসেবে নয়, বরং আপাতত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করবেন। জুলাই জাতীয় সনদ (জুলাই চার্টার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এর বিধি অনুযায়ী এই বিশেষ প্রক্রিয়ার সূচনা হতে যাচ্ছে।
দ্বৈত শপথের নতুন ফর্মুলা
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রিয়াজ পূর্বে জানিয়েছিলেন যে, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি পৃথক শপথ গ্রহণ করতে হবে। প্রথমটি সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য হিসেবে এবং দ্বিতীয়টি সংবিধান সংস্কার পরিষদ সদস্য হিসেবে।
তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আপাতত তারা শুধুমাত্র ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়ে কাজ শুরু করবেন।
এই বিশেষ পরিষদের মেয়াদ হবে ১৮০ কর্মদিবস বা প্রায় ৬ মাস। এই সময়ের মধ্যে জুলাই সনদে উল্লেখিত সংস্কার প্রস্তাবগুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
১৮০ দিন পর সংবিধানের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন শেষে তারা পূর্ণাঙ্গ সংসদ সদস্য হিসেবে আইনসভার স্বাভাবিক কার্যক্রমে অংশ নেবেন।
গণভোটের ম্যান্ডেট ও জুলাই সনদ
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পক্ষ প্রায় ৬৮-৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
এই বিপুল জনসমর্থনকেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মূল ভিত্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে।
অধ্যাপক আলী রিয়াজ বলেন, “জনগণ স্পষ্টভাবে পরিবর্তন ও সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। এটি জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য স্বীকৃতি।
আমরা আশা করি সব রাজনৈতিক দল জনগণের এই রায়কে সম্মান জানাবে।”
বিএনপির সিদ্ধান্তহীনতা ও জামায়াতের সম্মতি
সংসদের এই নতুন রূপান্তর নিয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে।
বিএনপি এখনও এই বিশেষ শপথ গ্রহণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
দলটির উচ্চপর্যায়ের সূত্রমতে, বিদ্যমান সংবিধান অনুসরণ করে কেবল এমপি হিসেবে শপথ নেওয়াই বেশি যৌক্তিক।
উচ্চকক্ষ গঠনসহ জুলাই সনদের কয়েকটি প্রস্তাবে বিএনপি ইতিপূর্বে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা দ্বিমত পোষণ করেছে।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সম্মতি জানিয়েছে।
তারা মনে করছে, জুলাই বিপ্লবের মূল স্পিরিট রক্ষা করতে সংবিধানের আমূল সংস্কার জরুরি।
শপথ অনুষ্ঠানের সময়সূচি ও আয়োজন
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানিয়েছে, আগামীকাল সকাল ১০টায় জাতীয় সংসদ ভবনে শপথ অনুষ্ঠান শুরু হবে। সম্ভবত প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচিতদের শপথ পাঠ করাবেন।
এরপর দ্বিতীয় দফার শপথ বা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা এতে অংশ নেবেন কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা কাটেনি।
বিকেল ৪টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।
এই মেগা অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি প্রায় ১২০০ অতিথি উপস্থিত থাকবেন বলে নিশ্চিত করেছে প্রশাসন।
সমালোচনা ও সম্ভাবনা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ এই প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে বলছেন, নির্বাচিত সংসদকে সরাসরি আইনসভা হিসেবে কাজ করতে না দিয়ে ‘সংস্কার পরিষদ’-এ রূপান্তরিত করায় রাষ্ট্রীয় কাজে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হতে পারে।
তবে জুলাই বিপ্লবের পক্ষের শক্তিরা মনে করেন, সংবিধান সংস্কার না করে পুরনো কাঠামোতে সংসদ চললে বিপ্লবের উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।
উপসংহার
আগামীকালের শপথ অনুষ্ঠান কেবল সরকার গঠনের নয়, বরং বাংলাদেশের সংবিধান নতুন করে ঢেলে সাজানোর এক ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা।
বিএনপি এই প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত শামিল হয় কি না এবং ১৮০ দিনের এই সংস্কার কার্যক্রম কতটা ফলপ্রসূ হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামীর বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা।
