শফিকুল আলম ও আজাদ মজুমদারের নতুন কর্মসংস্থান নিয়ে বিতর্ক। এমজিএইচ গ্রুপের সিইওর মামলা প্রত্যাহার ও ‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’র সম্পাদকীয় পদের নেপথ্য সমীকরণ জানুন।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা: ক্ষমতা আর রাজনীতির অলিগলিতে অনেক সমীকরণই দৃশ্যমান হয় দায়িত্ব হস্তান্তরের পর। সদ্য বিলুপ্ত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের শীর্ষ দুই কর্মকর্তার দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন কর্মসংস্থান এখন টক অফ দ্য কান্ট্রি। প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম এবং উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার দায়িত্ব ছাড়ার মাত্র একদিনের মাথায় যোগ দিয়েছেন নতুন ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’-তে। তবে এই যোগদান কেবল একটি পেশাগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকরা;
এর পেছনে একটি বিশাল দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারের গল্প জড়িয়ে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে নতুন মিশন
শফিকুল আলম ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন যে-
তিনি ‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’র সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং তার সাথে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন আজাদ মজুমদার।
সরকারের পতনের পর একদিনের জন্যও কর্মহীন না থেকে এত দ্রুত একটি বড় মিডিয়া হাউজে উচ্চপদে আসীন হওয়াকে অনেকে ‘পূর্বনির্ধারিত সমঝোতা’র ফসল হিসেবে মনে করছেন।
এমজিএইচ গ্রুপ ও ১৩৬ কোটি টাকার সেই মামলা
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’র বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ (MGH) গ্রুপ, যার প্রধান এই গ্রুপের সিইও আনিস আহমেদ গোর্কি।
গোর্কির বিরুদ্ধে ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ১৩৬ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা করেছিল।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে দুদক এই মামলার চার্জশিটও অনুমোদন করে।
যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল যে, ১৭ কোটি টাকারও বেশি সম্পদের কোনো বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি।
কিন্তু পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায় অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর।
চার্জশিট থেকে অব্যাহতি: এক অবিশ্বাস্য আইনি মোড়
২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর ঢাকা মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালত সরকার ও দুদকের আবেদনের প্রেক্ষিতে আনিস আহমেদের মামলাটি প্রত্যাহারের আদেশ দেন।
যে মামলার চার্জশিট কয়েক মাস আগে অনুমোদিত হয়েছিল,
তা হঠাৎ ‘পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব’ অজুহাতে প্রত্যাহার করে নেওয়াকে নজিরবিহীন বলছেন আইনজ্ঞরা।
‘পুরস্কার’ নাকি কাকতালীয় ঘটনা?
জনমনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় শফিকুল আলম ও আজাদ মজুমদার কি এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর মামলা প্রত্যাহারে কোনো বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন?
সেই সুবিধার বিনিময়েই কি ‘দ্য ডেইলি ওয়াদা’র শীর্ষ পদগুলো তাদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল?
তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে এমজিএইচ গ্রুপের কোনো ধরনের ‘গোপন লেনদেন’ বা ‘কুইড প্রো কুও’ (সুবিধার বিনিময়ে সুবিধা) ঘটেছিল কি না,
তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে।
দুদকের দ্বিমুখী অবস্থান ও জনমনে সংশয়
দুদক এক সময় বলেছিল আনিস আহমেদের সম্পদের বৈধ উৎস নেই,
আবার অক্টোবর মাসে তারাই আদালতকে জানালো যে মামলা চালানোর মতো তথ্য নেই।
তদন্তাধীন একটি বিষয়ে দুদকের এই অবস্থান পরিবর্তন এবং এর পরপরই সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ওই ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে যোগদান একটি গভীর যোগসূত্রকে নির্দেশ করে।
আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় গণমাধ্যমের পর্যবেক্ষণ
বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এবং বিভিন্ন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ইতিপূর্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে ‘চাপের মুখে মামলা প্রত্যাহার’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স বা আল জাজিরা-র বিভিন্ন প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের সংস্কার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে নেতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
পেশাদারিত্বের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন
সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা হলেও, সরাসরি ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে কোনো বিতর্কিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর অধীনে কাজ শুরু করা নৈতিকভাবে কতটা সংগত,
তা নিয়ে সাংবাদিক সমাজেই বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
শফিকুল আলম দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থায় কাজ করলেও তার এই নতুন পথচলা রাজনৈতিকভাবে কলঙ্কিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তদন্ত প্রয়োজন সত্যের স্বার্থে
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
যদি প্রমাণিত হয় যে এমজিএইচ গ্রুপের মামলা প্রত্যাহারের বিনিময়ে এই নিয়োগগুলো দেওয়া হয়েছে, তবে তা হবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের এক নিকৃষ্ট উদাহরণ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি নিয়ে একটি স্বাধীন তদন্ত হওয়া জরুরি, যাতে জানা যায়—
আদালতের মাধ্যমে মামলা প্রত্যাহার কি আইনি কারণে ছিল, নাকি এটি ছিল কেবলই একটি উচ্চপদস্থ ‘চাকরি বাগানোর’ কৌশল।
