বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্প্রতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সমঝোতা চূড়ান্ত করার আগে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল—বিএনপি ও জামায়াত—এই বিষয়ে অবহিত ছিল এবং তারা নীতিগত সম্মতি দিয়েছিল। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে; এটি নির্বাচন-পূর্ব ‘হঠাৎ সিদ্ধান্ত’ ছিল না।
এই মন্তব্য আসে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুর-এর সঙ্গে বৈঠকের পর। বৈঠক-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আলোচনাগুলো বহু ধাপে হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির প্রেক্ষাপটে এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল।
চুক্তি কি নির্বাচনের ঠিক আগে?
সমালোচকদের একটি বড় অংশের অভিযোগ—চুক্তিটি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের ঠিক আগে সম্পন্ন হয়েছে।
এ বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আলোচনা শুরু হয় ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সেই সময় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি, শুল্ক কাঠামো এবং সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে প্রাথমিক আলাপ হয়।
এরপর এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র শতাধিক দেশের ওপর বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলে বাংলাদেশও সেই তালিকায় পড়ে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে বৈশ্বিক বাণিজ্যে কড়াকড়ি আরোপের অংশ হিসেবে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা দেন। পরে আলোচনার মাধ্যমে তা ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। ১ আগস্ট থেকে সংশোধিত হার কার্যকর হয়। পূর্বের ১৫ শতাংশ শুল্কসহ মোট কার্যকর শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, “এটি একদিনে হয়নি। এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত টানা আলোচনা হয়েছে।
শুধু বাংলাদেশের সঙ্গে নয়, আরও অনেক দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করেছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রাথমিক সমঝোতা তৈরি হয়।”
বিএনপি-জামায়াতের সম্মতির প্রসঙ্গ
মন্ত্রী দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দপ্তর (USTR) বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে নির্বাচনের আগেই মতবিনিময় করেছিল।
সেই আলোচনায় তারা চুক্তির কাঠামো সম্পর্কে অবহিত ছিল এবং নীতিগতভাবে আপত্তি করেনি।
তিনি বলেন, “এটি অন্ধকারে করা হয়নি। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা মাথায় রেখেই আলোচনা হয়েছে।”
তাঁর ভাষ্যমতে, এ ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি এককভাবে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়; বরং দীর্ঘ আলোচনার ফল।
তবে বিএনপি বা জামায়াতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
শুল্ক কমানোর কৌশল: কী ছিল আলোচনার কেন্দ্রে?
আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ বা পাল্টা শুল্ক।
বাংলাদেশ প্রস্তাব দেয়, যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা কৃত্রিম তন্তু (ম্যানমেড ফাইবার) দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ পাল্টা শুল্ক দেওয়া হোক।
যুক্তরাষ্ট্র এ প্রস্তাব বিবেচনায় নিতে সময় নেয়। এছাড়া ‘রুলস অব অরিজিন’ বা উৎপত্তি-নিয়ম নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা চলে।
কোনো পণ্যকে কোন দেশের উৎপাদিত হিসেবে গণ্য করা হবে—এই নীতিগত প্রশ্ন রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবশেষে সমঝোতায় পৌঁছাতে কয়েক মাস সময় লাগে।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা এমন কিছু চাইনি যা আমাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়।
বরং মার্কিন কটন ব্যবহার করলে শুল্ক সুবিধা পাওয়া গেলে তা আমাদের পোশাক শিল্পের জন্য ইতিবাচক হবে।”
অর্থনৈতিক প্রভাব: লাভ না চাপ?
বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। যুক্তরাষ্ট্র সেই রপ্তানির অন্যতম বৃহৎ বাজার।
অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ফলে রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ে। তবে আলোচনার মাধ্যমে শুল্কহার কমানোকে সরকার ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে।
এই চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গম আমদানি বাড়ানো হয়েছে এবং তুলা, সয়াবিনসহ আরও কিছু কৃষিপণ্য আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি বাণিজ্য ভারসাম্য সমন্বয়ের কৌশল হতে পারে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে—এতে কি আমদানি নির্ভরতা বাড়বে? দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর কি চাপ পড়বে? সরকার বলছে, বাণিজ্য ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারস্পরিক সুবিধার পথ খোঁজা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
চুক্তিটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চূড়ান্ত হওয়ায় বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে।
সমালোচকরা বলছেন, একটি অনির্বাচিত সরকারের বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি করা কতটা যুক্তিযুক্ত—সে প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছে, এমন একটি চুক্তি ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকারের ওপর দায় চাপাতে পারে।
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য জরুরি ছিল।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বহুমাত্রিক। নিরাপত্তা, উন্নয়ন সহযোগিতা, শ্রম অধিকার ও মানবাধিকার প্রশ্নে দুই দেশের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মতপার্থক্য দেখা গেছে।
সাম্প্রতিক এই বাণিজ্য চুক্তি সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে এবং শুল্ক কমাতে কৌশলগত নমনীয়তা দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, নির্বাচন-পূর্ব সময় নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের নীতিনির্ধারণের স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।
সামনে কী?
চুক্তির বাস্তবায়ন এখন মূল চ্যালেঞ্জ। শুল্ক কমানোর সুবিধা রপ্তানিকারকেরা কত দ্রুত পাবে, মার্কিন বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান কতটা শক্তিশালী হবে—এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি আমদানি বাড়ানোর ফলে বাণিজ্য ভারসাম্যে কী প্রভাব পড়ে, সেটিও নজরে রাখতে হবে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের দাবি অনুযায়ী, এটি দীর্ঘ আলোচনার ফল এবং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া সিদ্ধান্ত। তবে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ চলতেই থাকবে।
উপসংহার
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি এখন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
বিএনপি-জামায়াতের সম্মতির দাবি, নির্বাচন-পূর্ব সময়ের বিতর্ক, শুল্ক কমানোর কৌশল এবং আমদানি-রপ্তানি ভারসাম্যের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে এটি বহুমাত্রিক ইস্যু।
আগামী দিনে এই চুক্তির সুফল কতটা বাস্তবায়িত হয় এবং জাতীয় অর্থনীতিতে তার প্রভাব কেমন পড়ে—তা নির্ভর করবে নীতির ধারাবাহিকতা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং বাণিজ্য কৌশলের ওপর।
