জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৬তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস আজ। টুঙ্গিপাড়ার সেই ‘খোকা’ থেকে বিশ্বনেতা হয়ে ওঠার মহাকাব্যিক গল্প।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
আজ ১৭ মার্চ। বাঙালি জাতির ক্যালেন্ডারে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও মাহেন্দ্রক্ষণ। আজ থেকে ১০৬ বছর আগে ১৯২০ সালের এই দিনে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ার এক নিভৃত পল্লীতে জন্ম নিয়েছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দিনটি একই সঙ্গে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবেও উদযাপিত হচ্ছে, যা বঙ্গবন্ধুর শিশুদের প্রতি অকৃত্রিম মমত্ববোধের এক অনন্য স্বীকৃতি।


টুঙ্গিপাড়ার সেই চঞ্চল শৈশব ও ‘খোকা’র উত্থান
১৯২০ সালের বসন্তের এক শান্ত দিনে শেখ লুৎফর রহমান ও সায়েরা খাতুনের ঘর আলো করে এসেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আদরের সেই ‘খোকা’ বড় হয়ে যে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙবেন, তা হয়তো তখন কেউ কল্পনাও করেনি। টুঙ্গিপাড়ার মধুমতী নদীর তীরে বেড়ে ওঠা এই কিশোরের মনে শৈশব থেকেই ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি অসীম দরদ। নিজের গোলার ধান বিলিয়ে দেওয়া কিংবা নিজের ছাতা অন্যকে দিয়ে দেওয়ার মতো অসংখ্য গল্প তাঁর মানবিক সত্তার জানান দেয়।
ছাত্র রাজনীতি থেকে বাঙালির অকুতোভয় নেতা
গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে পড়াশোনা শুরু করে পরবর্তীতে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পা রাখা—এটাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে এসে তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন এক লড়াকু সৈনিক। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি, ৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ৬৬-এর ছয় দফা এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান—প্রতিটি ধাপে শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে উঠেছিলেন বাঙালির অধিকার আদায়ের সমার্থক।
১৯৬৯ সালে কারাগার থেকে মুক্তির পর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র-জনতার উত্তাল মিছিলে তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
সেদিন থেকেই তিনি আর কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং সাত কোটি বাঙালির প্রাণের স্পন্দনে পরিণত হন।
৭ মার্চের মহাকাব্যিক ভাষণ ও স্বাধীনতার সূর্যদয়
বঙ্গবন্ধুর জীবন মানেই লড়াইয়ের এক দীর্ঘ ইতিহাস। তাঁর জীবনের ৪,৬৮২ দিন কেটেছে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে।
কিন্তু কোনো অত্যাচারই তাঁকে দমাতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা— “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
তাঁর এই ভাষণটি আজ ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য ঐতিহ্য।
দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর আজীবন লালিত স্বপ্নের ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নেয়।
পাকিস্তানের কারাগার থেকে বীরের বেশে ফিরে এসে তিনি পুনর্গঠনে হাত দেন যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশের।
১৭ মার্চ কেন জাতীয় শিশু দিবস?
বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন, আজকের শিশুরাই আগামীর সোনার বাংলা গড়ার কারিগর।
তিনি যখনই সময় পেতেন, শিশুদের সঙ্গে মিশে যেতেন।
শিশুদের প্রতি তাঁর এই অনন্য ভালোবাসা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই ১৯৯৬ সালে তাঁর জন্মদিনটিকে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
শিশুদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও সংগ্রামী চেতনা ছড়িয়ে দেওয়াই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
সোনার বাংলার স্বপ্ন ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা
বঙ্গবন্ধু একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্ন দেখেছিলেন।
তাঁর অর্থনৈতিক দর্শন ছিল সাধারণ মানুষের মুক্তি।
১০৬তম জন্মবার্ষিকীতে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের আত্মোপলব্ধির সময় এসেছে—আমরা কি সত্যিই তাঁর স্বপ্নের সেই বাংলাদেশ গড়তে পেরেছি?
আজ দেশে উন্নয়ন হচ্ছে, অবকাঠামো বদলাচ্ছে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ‘দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক’ সমাজ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমাদের আরও বহুদূর যেতে হবে।
শিশুদের জন্য বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা: সাহস ও দেশপ্রেম
নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর জীবনী কেবল একটি ইতিহাস নয়, এটি একটি জীবন্ত পাঠশালা।
প্রতিকূল পরিবেশে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে সত্যের পথে অবিচল থাকতে হয়—তা শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী থেকে শেখা সম্ভব।
আজকের শিশুরা যেন বঙ্গবন্ধুর মতো সাহসী, পরোপকারী এবং দেশপ্রেমিক হয়ে গড়ে ওঠে, সেটাই হোক এবারের জন্মদিনের অঙ্গীকার।
শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় পালিত হচ্ছে দিনটি
দিবসটি উপলক্ষে টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদনসহ দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে বিশেষ আলোকপাত করা হচ্ছে।
অমর শেখ মুজিব
দেহগতভাবে বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও চেতনা বাঙালির রক্তে মিশে আছে।
যতক্ষণ এই মানচিত্রে লাল-সবুজ পতাকা উড়বে, ততক্ষণ বঙ্গবন্ধু অমর হয়ে থাকবেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।
তাঁর ১০৬তম জন্মবার্ষিকীতে আমাদের শপথ হোক—হিংসা ও ভেদাভেদ ভুলে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
