রোহিঙ্গাদের জন্য আসা তুরস্কের যাকাতের অর্থ দিয়ে ইফতার পার্টি করছে ছাত্রশিবির। দাতব্য সংস্থার অনুদান নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য
বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা: বিশ্বের যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে তুরস্কের সাধারণ মানুষের দান করা যাকাতের অর্থ নিয়ে বাংলাদেশে এক নজিরবিহীন জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। তুরস্কভিত্তিক আধাসরকারী দাতব্য সংস্থা ‘টার্কি দিয়ানত ভাকফি’ (Turkey Diyanet Vakfi)-এর পক্ষ থেকে পাঠানো মানবিক সহায়তার একটি বড় অংশ লবিংয়ের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মহলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দকৃত এই অর্থের সিংহভাগ ব্যয় করা হচ্ছে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রশিবিরের জাঁকজমকপূর্ণ ইফতার পার্টির আয়োজনে।
টার্কি দিয়ানত ভাকফি: মহৎ উদ্দেশ্যের অপব্যবহার
তুরস্কের ধনী ও সচ্ছল মুসলিমদের কাছ থেকে যাকাত এবং সদকা সংগ্রহ করে তা বিশ্বজুড়ে অভাবী মানুষের কল্যাণে ব্যয় করে দিয়ানত ভাকফি। বিশেষ করে মধ্য আফ্রিকা এবং এশিয়ার শরণার্থী শিবিরগুলোতে তাদের বিশাল কার্যক্রম রয়েছে। বাংলাদেশেও এই সংস্থার অনুদান নিয়মিত আসে, যা মূলত কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশ্রিত মানুষদের খাদ্য ও চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ থাকে। কিন্তু এবার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
লবিং ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই ত্রাণের টাকা সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জামায়াত-শিবির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘উপহার’র আড়ালে যাকাতের টাকা
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ (চবি) দেশের প্রায় প্রতিটি বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশাল পরিসরে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করছে ছাত্রশিবির। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এই আয়োজনকে ‘তুরস্কের উপহার’ হিসেবে গ্রহণ করলেও পর্দার আড়ালের সত্যটি অত্যন্ত তিক্ত।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভাবী মানুষের জন্য পাঠানো যাকাতের এই টাকা দিয়েই কেনা হচ্ছে ছাত্র-শিক্ষকদের ইফতারের প্লেট।
ইসলামী বিধান অনুযায়ী, যাকাতের টাকা কেবল হকদার বা অতি দরিদ্রদের জন্য প্রযোজ্য।
অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকরা, যারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী, তাদের পেটে যাকাতের এই টাকা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এটি কেবল ধর্মীয় বিধানের লঙ্ঘনই নয়, বরং দাতা দেশের মানুষের সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।
পাঁচ তারকা হোটেলে বিত্তবানদের ‘যাকাত ভক্ষণ’
অভিযোগের তীর কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠেই সীমাবদ্ধ নেই।
জামায়াতের বিভিন্ন ইফতার মাহফিলে, যেখানে সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি, মন্ত্রী এবং সমাজের উচ্চবিত্তরা উপস্থিত থাকছেন, সেখানেও তুরস্কের এই অনুদানের অর্থ ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত এসব রাজকীয় ইফতারিতে দিয়ানত ভাকফি’র লোগো সম্বলিত ব্যানার বা ছোট স্ট্যান্ড ব্যবহারের মাধ্যমে দাতা সংস্থাকে তুষ্ট করার চেষ্টা করা হলেও বাস্তব চিত্রটি হলো—গরিবের হক মেরে ধনীদের আপ্যায়ন করা হচ্ছে।
তথ্য গোপন ও কৌশলী প্রচারণা
তুরস্কের দাতব্য সংস্থাটিকে দেখানোর জন্য কিছু ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হলেও মূল ঘটনাটি সুকৌশলে গোপন রাখা হয়েছে।
তুরস্কের ভাষায় লেখা ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করছে এটি একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সৌজন্য। কিন্তু দাতা সংস্থা কি জানে যে, তাদের পাঠানো অর্থ রোহিঙ্গাদের খুপড়ি ঘরে না গিয়ে ব্যয় হচ্ছে রাজনৈতিক দলের দলীয় কর্মসূচিতে?
একজন শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা জানতাম এটি তুরস্কের পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা উপহার।
যদি জানতাম এটি যাকাতের টাকা এবং তা রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ ছিল, তবে আমরা কেউ এই খাবার মুখে তুলতাম না।”
রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও জনমতের প্রতিফলন
জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রায়ই বলে থাকেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলে মুসলিম বিশ্বের যাকাতের টাকা দেশে আনার ব্যবস্থা করবেন।
কিন্তু বর্তমান এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সেই টাকা জনকল্যাণের চেয়ে দলীয় কাঠামো শক্তিশালী করতেই বেশি ব্যয় হতে পারে।
রোহিঙ্গাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করে এভাবে রাজনৈতিক প্রচার চালানোকে সচেতন মহল একটি ‘মানবিক অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করছেন।
দাতা সংস্থার নজরদারি ও মিডিয়া পার্সেন্টেজ
অভিযোগ উঠেছে, এই বিশাল অপকর্ম ঢাকা দিতে গণমাধ্যমের একটি অংশকে নির্দিষ্ট ‘পার্সেন্টেজ’ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
এছাড়া তুরস্কের প্রতিনিধিদের হাতে এককালীন কিছু টাকা ও ছবি তুলে দিয়ে তাদের আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে, সব টাকা সঠিক খাতে ব্যয় হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে তদারকির অভাব থাকায় এই অনিয়ম আরও ডালপালা মেলছে।
নৈতিকতা ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতা
যাকাতের টাকা নিয়ে এই লুকোচুরি কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠনের আদর্শিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ করে।
তুরস্কের সাধারণ মানুষের কষ্টের উপার্জন যেখানে একটি শরণার্থী শিশুর দুধের যোগান দেওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনৈতিক স্বার্থে।
এই জালিয়াতি বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি এবং দাতা সংস্থাগুলোর আরও সচেতন হওয়া জরুরি।
