সেন্টমার্টিনে ঘাঁটি ও নতুন রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র নিয়ে শেখ হাসিনার সেই সতর্কবার্তা কি আজ বাস্তব? প্রফেসর আরিফ খানের বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অনুসন্ধানী রিপোর্ট।
প্রফেসর ডঃ আরিফ খান, সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটি, লন্ডন:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ভারত বিরোধিতা’ বরাবরই একটি জনপ্রিয় কার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল ও বিগত ৫ই আগস্ট পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ এই বিরোধিতার সারবত্তাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। লন্ডনের সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটির প্রফেসর আরিফ খানের মতে, এদেশের আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের ভারত বিরোধিতা কেবলই ভিত্তিহীন ফাঁকা আওয়াজ। জনসমর্থন আদায়ের এই নোংরা অপকৌশলের সাথে বাস্তবতার ন্যূনতম সম্পর্ক নেই। বরং গত এক বছরে ভারতপ্রীতির এমন সব উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে যা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলকেও ছাড়িয়ে গেছে।
ভারতপ্রীতির ‘তবলা ও ঢোল’: বাস্তব বনাম স্লোগান
প্রফেসর আরিফ খান তার বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আগের সকল চুক্তি বহাল রেখেছে। শুধু তাই নয়, নতুন বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি, ২০০ রেলের বগি ক্রয় এবং বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ-চাল-আলু আমদানির মাধ্যমে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা গেছে ইলিশ রপ্তানিতে। দেশের বাজারে অগ্নিমূল্য থাকা সত্ত্বেও ১২০০ টন ইলিশ প্রায় অর্ধেক দামে ভারতে পাঠানো হয়েছে। প্রফেসর খান মনে করেন, ভন্ডরা আগে ‘দেশ বিক্রির করুণ বেহালা’ বাজিয়ে এখন নিজেরাই ‘ভারত প্রেমের তবলা ও ঢোল’ একত্রে বাজাচ্ছে। স্লোগানটি এখন ‘দিল্লী না ঢাকা’ বদলে ‘দিল্লী ও ঢাকা’ করা সময়ের ব্যাপার মাত্র।



পাকিস্তানপন্থী বনাম দেশপ্রেমিক আওয়ামী লীগ
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগকে প্রায়ই ‘ভারতের দালাল’ বলা হয়, অথচ তাদের সমর্থকদের কখনো ভারতের পতাকা নিয়ে উল্লাস করতে দেখা যায় না। তাদের মধ্যে দেশপ্রেমের শিকড় অনেক গভীরে। বিপরীতে, বর্তমানে প্রতিটি জাতীয় দিবসে একদল মানুষকে পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এই পাকিস্তানপন্থী মনোভাব ও রাজাকারী মানসিকতা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। মনে রাখতে হবে, ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদের বিক্ষোভের কারণেই আজ আমরা বাংলায় কথা বলার অধিকার পেয়েছি।
বৈশ্বিক অর্থনৈতিক করিডোর ও আঞ্চলিক একতার গুরুত্ব
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠে জোটবদ্ধ হয়েছে কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য।
- ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU): ১০০ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর পর তারা করমুক্ত সাপ্লাই চেইন গড়ে উৎপাদনশীলতা বাড়িয়েছে।
- উত্তর আমেরিকা (USMCA): কানাডা, মেক্সিকো ও আমেরিকা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে জোটবদ্ধ হয়েছে।
প্রফেসর আরিফ খান প্রশ্ন তুলেছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় যদি ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও পাকিস্তান একতা আনতে পারে, তবে উৎপাদনের দিক থেকে এই অঞ্চল আমেরিকা বা ইউরোপকেও ছাড়িয়ে যাবে। কিন্তু আমেরিকা ও ইউরোপ চায় না এই অঞ্চলে এমন একতা আসুক। আর সে কারণেই কি ইমরান খান বা শেখ হাসিনার মতো স্বাধীনচেতা সরকারগুলোর পতন ঘটানো হয়েছে? এই প্রশ্নটি এখন ভূ-রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত জোরালো।
| প্রকল্প | নিয়োজিত সংস্থা/দেশ | কৌশলগত লক্ষ্য |
| পায়রা বন্দর | চীন | স্বল্প মূল্যে শ্রম ও গার্মেন্টস সেক্টরে বিনিয়োগ আকর্ষণ। |
| মাতারবাড়ি প্রকল্প | জাইকা (জাপান) | উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে জাপানিজ প্রোডাকশন হাবের সংযোগ। |
| মোংলা বন্দর উন্নয়ন | ভারত | কাঁচামাল (তুলা, ডাল, তেল) সস্তায় সরবরাহ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা। |
| নন-অ্যালিনমেন্ট | স্বাধীন আর্থিক কাঠামো | কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে যোগ না দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা। |
সেই ‘শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি’ ও নতুন রাষ্ট্রের ষড়যন্ত্র
২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, এক ‘শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি’ তাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন—বাংলাদেশে বিদেশি শক্তিকে সামরিক ঘাঁটি গড়তে দিলে তাকে ক্ষমতায় ফিরতে সাহায্য করা হবে। তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন এলাকা, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে একটি ‘পৃথক রাষ্ট্র’ গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে।
৫ই আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে প্রফেসর আরিফ খান মনে করেন, সেই সতর্কবার্তা আজ আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
শেখ হাসিনা বিশ্ববাটপার ইউনূসকে ঠিকই চিনতে পেরেছিলেন, যা আজ তার কট্টর সমালোচকরাও স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছেন।
এনআইএ-র অভিযান ও ম্যাথিউ ভ্যানডাইক রহস্য
ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা National Investigation Agency (NIA) সম্প্রতি মিজোরামে এক গোপন অভিযানে মার্কিন নাগরিক ম্যাথিউ ভ্যানডাইক (Matthew VanDyke) সহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। অভিযোগ উঠেছে, তারা পর্যটক ভিসায় এসে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও ড্রোন প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। ভ্যানডাইক আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ‘Sons of Liberty International’ নামক একটি সশস্ত্র প্রশিক্ষণ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা।
এই গ্রেপ্তারের ঘটনাটি শেখ হাসিনার সেই দূরদর্শী সতর্কবার্তার সাথে এক গভীর যোগসূত্র তৈরি করছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতা সৃষ্টি করে সামরিক আধিপত্য বিস্তারের যে নীল নকশা শেখ হাসিনা রুখে দিতে চেয়েছিলেন, এনআইএ-র এই অভিযান তাকেই পুনর্বার সামনে নিয়ে এসেছে।
দাতা সংস্থা ও দাতা দেশগুলোর ভূমিকা
পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীলতা এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতার পেছনে দাতা সংস্থাগুলোর অর্থায়নের ভূমিকা নিয়ে প্রফেসর খান উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অভিযোগ উঠেছে যে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত তহবিল থেকে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন করা হচ্ছে।
এটি মূলত একটি সুপরিকল্পিত জুলাই ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে, যা আমেরিকার ৪ঠা জুলাই স্বাধীনতা দিবসের রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না—তা ভাববার বিষয়।
ফলবতী গাছের ওপরই ঢিল পড়ে বেশি
প্রফেসর আরিফ খানের মতে, শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা নিয়ে আজ শুধু ভারতবর্ষ নয়, গোটা পৃথিবী গর্ব করে। তিনি যে ষড়ষন্ত্রের জাল ছিঁড়ে দিতে চেয়েছিলেন, তা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করছে। প্রবাদ আছে, যে গাছ ফল দেয় বেশি, সে গাছই ঢিল সহ্য করে বেশি। শেখ হাসিনা উন্নয়নের ফল দিয়েছেন বলেই তাকে বারংবার হ্ত্যা ও ক্ষমতাচ্যুতির ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করতে হয়েছে। আজ সময় এসেছে বাস্তবতাকে বোঝার—আবেগ আর ভন্ডামির ভারত বিরোধিতার আড়ালে আমরা আমাদের সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলছি কি না, তা নিয়ে এখনই সচেতন হওয়ার সময়।
