ইউনূস ঘনিষ্ঠ লামিয়া মোর্শেদ, ঢাবির সাবেক ভিসি ড. নিয়াজ ও সাবেক সচিব সেলিম উদ্দিনের রাষ্ট্রদূত নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করেছে বর্তমান সরকার।
বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া বিতর্কিত অনেক সিদ্ধান্তের মধ্যে অন্যতম ছিল পেশাদার কূটনীতিকদের পরিবর্তে পছন্দসই ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রচেষ্টা। তবে বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই প্রক্রিয়াগুলোতে বড় ধরণের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী লামিয়া মোর্শেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খান এবং সাবেক সচিব সেলিম উদ্দিনকে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
চলতি মাসের প্রথম ভাগে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই তিন ব্যক্তির বিষয়ে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যা ড. ইউনূসের পূর্ববর্তী প্রশাসনের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লামিয়া মোর্শেদের ‘নেদারল্যান্ডস স্বপ্ন’ ও এগ্রিমোর অপেক্ষা
ড. ইউনূসের দীর্ঘদিনের ছায়াসঙ্গী এবং এসডিজি-বিষয়ক সাবেক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোর্শেদের পছন্দ ছিল ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডস। তাকে হেগে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করার জন্য দেশটির কাছে ‘এগ্রিমো’ বা সম্মতি চেয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছিল গত সরকার। গত বছরের নভেম্বরে বিষয়টি জানাজানি হলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সূত্র মতে, ইউনূস প্রশাসন তাদের মেয়াদের শেষ দিন পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের সম্মতির জন্য অপেক্ষা করলেও দেশটি কোনো ইতিবাচক সাড়া দেয়নি।
পরবর্তীতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে সেই প্রক্রিয়া বাতিল করে পেশাদার কূটনীতিক ফাইয়াজ মুর্শিদ কাজীকে সেখানে নিয়োগ দিয়েছে, যার এগ্রিমো ইতোমধ্যেই ঢাকা হাতে পেয়েছে। লামিয়া মোর্শেদের এই নিয়োগ বাতিলের ঘটনাকে অনেকে ইউনূস রেজিমে দুর্নীতির সহযোগী হিসেবে তার কথিত ভূমিকার প্রতি জনগণের ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
ড. নিয়াজ আহমেদ: ইরান না কি ডেনমার্ক?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খানের রাষ্ট্রদূত হওয়ার চেষ্টাও ছিল চোখে পড়ার মতো। শুরুতে ডেনমার্কে তার নাম প্রস্তাব করা হলেও বিতর্কের মুখে তা বাতিল হয়। পরবর্তীতে ইরান সরকার তাকে গ্রহণ করতে সম্মত হলেও ড. নিয়াজ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে যেতে আগ্রহী ছিলেন না।
অভিযোগ রয়েছে, ড. নিয়াজ নিজের নিয়োগ নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তৎকালীন বিএনপি নেতার গুলশান কার্যালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে দফায় দফায় ধরনা দিয়েছিলেন। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের পরাজয় ও শিবিরের উত্থানে তার কথিত ভূমিকার কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে তার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ছিল, যা শেষ পর্যন্ত তার কূটনৈতিক ক্যারিয়ারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
| ব্যক্তির নাম | প্রস্তাবিত দেশ | বর্তমান অবস্থা | মূল কারণ |
| লামিয়া মোর্শেদ | নেদারল্যান্ডস | বাতিল ও স্থগিত | এগ্রিমো না পাওয়া ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। |
| ড. নিয়াজ আহমেদ | ডেনমার্ক/ইরান | বাতিল ও স্থগিত | বিতর্কিত ভাবমূর্তি ও অনাগ্রহ। |
| সেলিম উদ্দিন | মিশর | স্থগিত | মিশরের পক্ষ থেকে সম্মতির অভাব। |
| ফাইয়াজ মুর্শিদ কাজী | নেদারল্যান্ডস | নিয়োগ চূড়ান্ত | পেশাদার কূটনীতিক ও এগ্রিমো প্রাপ্ত। |
সাবেক সচিব সেলিম উদ্দিনের ‘মিশর মিশন’ ব্যর্থ
বাণিজ্যসচিব হিসেবে অবসরে যাওয়া সেলিম উদ্দিনকে মিশরে রাষ্ট্রদূত করার পরিকল্পনা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের। আওয়ামী লীগ আমলের অন্যতম সুবিধাভোগী এই আমলা কায়রোর ‘সবুজ সংকেত’-এর অপেক্ষায় থাকলেও মিশর সরকার এ বিষয়ে দীর্ঘসময় কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তার বিষয়েও আগের প্রশাসনের সুপারিশ নাকচ করে দিয়েছে।
সরকারের নতুন নীতি: পেশাদারিত্বের জয়
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান নির্বাচিত সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় বড় ধরণের কোনো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পক্ষপাতী নয়।
তিনি জানিয়েছেন, পেশাদার পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মাধ্যমেই দূতাবাসগুলো পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এটি মূলত রাজনৈতিক পুরস্কার হিসেবে রাষ্ট্রদূত পদ ব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
ইউনূস রেজিমের ‘কুশীলবদের’ বিচার ও জনআকাঙ্ক্ষা
লামিয়া মোর্শেদ ও ড. নিয়াজ আহমেদের মতো ব্যক্তিদের নিয়োগ স্থগিত হওয়ার সংবাদে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে।
বিশেষ করে লামিয়া মোর্শেদকে ড. ইউনূসের আর্থিক অনিয়মের সহযোগী এবং ড. নিয়াজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় রাজনীতি (শিবির তোষণ) প্রতিষ্ঠার কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। জনদাবি উঠেছে যে, কেবল নিয়োগ বাতিল নয়, বরং দেশ ধ্বংস ও দেশ বিক্রির ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এই কুশীলবদের সুষ্ঠু বিচারের আওতায় আনা হোক।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ কূটনীতি
বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের পরেই নেদারল্যান্ডসসহ অন্যান্য দেশে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত পেশাদার কূটনীতিকরা তাদের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।
সরকারের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনীতিকে আরও দক্ষ ও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সেইফ এক্সিট বন্ধের পথে?
লামিয়া মোর্শেদের মতো ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়ে ‘সেইফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থানের যে পথ ড. ইউনূস খুঁজছিলেন, বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্তে তা আপাতত রুদ্ধ হয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগের এই থাপ্পড় মূলত ইউনূস রেজিমের অপকর্মের প্রতি বর্তমান সরকারের একটি বলিষ্ঠ জবাব। জনগণের প্রত্যাশা, আগামী দিনগুলোতে কেবল যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদেরই বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা যাবে এবং দুর্নীতিবাজদের স্থান হবে কাঠগড়ায়।
