বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত বাংলাদেশের ইপিআই টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য ও বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের নেপথ্যে প্রকৃত সত্য কী? জানুন হামের টিকা ও গাভির সহায়তা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা:
বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল পালকটির নাম ‘ইপিআই’ (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি)। ১৯৭৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রকল্পটি আজ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফের কাছে এক অনন্য ‘রোল মডেল’। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা কিছু মন্তব্য এবং হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে ওঠা অভিযোগ এই দীর্ঘদিনের সাফল্যকে বিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের দাবি—বিগত আট বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সরকারি নথিপত্র কি এই দাবিকে সমর্থন করে? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সমীকরণ?

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি বনাম আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানের দ্বন্দ্ব
গত রোববার এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল দেশের বর্তমান হামের পরিস্থিতির জন্য বিগত সরকারকে দায়ী করে বলেন, “গত আট বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি।” এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন করে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।
তবে ডব্লিউএইচও (WHO) এবং ইউনিসেফ-এর ‘ওয়েনিক’ (WUENIC) ২০২৪ সালের তথ্য বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজের (MCV1) কভারেজ ছিল ৯৭% এবং দ্বিতীয় ডোজের (MCV2) কভারেজ ছিল ৯৩%। এমনকি ২০২৩ সালের ইপিআই ফ্যাক্টশিট অনুযায়ী, ২০২২ সালে নিশ্চিত হামের কেস ছিল মাত্র ৩১১টি এবং ২০২৩ সালে তা আরও কমে ২৮০টিতে দাঁড়ায়। অর্থাৎ, গত কয়েক বছরে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত পর্যায়েই ছিল।
আওয়ামী লীগ আমলের স্বাস্থ্য বিপ্লব: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ
টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্যের সিংহভাগই অর্জিত হয়েছে গত দেড় দশকে।
১৯৭৯ সালে যেখানে পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুর হার ছিল মাত্র ২%, তা ২০২৪-২৫ সালে ৮৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
এই ধারাবাহিক সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পুরস্কারে ভূষিত করে ‘গাভি’ (Gavi, The Vaccine Alliance)।
বর্তমানে ইপিআই-এর মাধ্যমে বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্ট, ওপিভি, হাম-রুবেলা (MR), এবং পিসিভি-সহ মোট ১০টি রোগের প্রতিষেধক দেওয়া হচ্ছে। এই কর্মসূচির ফলে প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৯৪ হাজার শিশুর অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১ ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে এখানে ২৫ ডলারের সমপরিমাণ স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুফল মিলছে।

গাভি (Gavi)-এর অংশীদারিত্ব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে আসছে ‘গাভি’।
সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২৩ সালের শুরু পর্যন্ত তারা বাংলাদেশকে নিয়মিত টিকা, কোল্ড চেইন সরঞ্জাম এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে প্রায় ৪৮৯.৭ মিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যার বড় অংশই বিতরণ করা হয়েছে।
২০২৬ সালে এই সহায়তা শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফোরাম ফর হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং-এর জোরালো তদবিরে তা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, যদি গত আট বছর হামের টিকা দেওয়াই না হতো, তবে গাভি এবং ডব্লিউএইচও-এর মতো কঠোর তদারকিকারী সংস্থাগুলো কেন বাংলাদেশকে পুরস্কৃত করল এবং নিয়মিত অর্থায়ন চালিয়ে গেল?

ইপিআই: কেবল টিকাদান নয়, একটি সমন্বিত প্লাটফর্ম
বাংলাদেশের ইপিআই কর্মসূচি কেবল সুঁই ফোটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
এটি আজ ভিটামিন এ ক্যাপসুল বিতরণ, কৃমিনাশক ওষুধ এবং মাতৃস্বাস্থ্য সেবার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদেরও এই সেবার আওতায় আনা হয়েছে। শিশুমৃত্যুর হার (৫ বছরের কম বয়সী) ৮১.৫% হ্রাস পাওয়ার পেছনে এই কর্মসূচির অবদান অনস্বীকার্য।
১৯৭৯ সালে প্রতি ১০০০ জনে যেখানে ২১১ জন শিশুর মৃত্যু হতো, এখন তা কমে মাত্র ৩১ জনে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ: হামের প্রাদুর্ভাব কি সত্যিই ব্যবস্থাপনা সংকট?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। বিশ্বজুড়েই এর ছোটখাটো প্রাদুর্ভাব (Outbreak) দেখা দেয়।
একে কেন্দ্র করে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ‘ধ্বংস’ বলে অভিহিত করা বা দীর্ঘদিনের সফল কাভারেজকে অস্বীকার করা পেশাদারিত্বের পরিচায়ক নয়।
জুলাই-আগস্টে বিশেষ ক্যাম্পেইনের যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, তা নিয়মিত প্রক্রিয়ারই অংশ হতে পারত।
কিন্তু এর পেছনে রাজনৈতিক দোষারোপের সংস্কৃতি থাকলে তা স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে।
ভবিষ্যৎ ভাবনা: স্ব-নির্ভরতার পথে যাত্রা
গাভির সহায়তা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়লেও ধীরে ধীরে এই আন্তর্জাতিক অনুদান কমে আসবে।
তাই বাংলাদেশকে নিজস্ব অর্থায়নে টিকা ক্রয় এবং বিতরণ ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে এই সাফল্যকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
সমাপনী মন্তব্য
বাংলাদেশের ইপিআই সাফল্য কোনো বিশেষ দলের নয়, বরং এটি রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সহযোগী এবং হাজার হাজার মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীর সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক তথ্যকে অস্বীকার করা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
তথ্যসূত্র বলছে, হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব একটি চ্যালেঞ্জ হলেও তা গত আট বছরের ব্যর্থতা নয়।
বরং নিরবচ্ছিন্ন টিকা প্রদানের মাধ্যমেই বাংলাদেশ আজ এমডিজি-৪ (MDG 4) অর্জনে বিশ্বের হাতেগোনা ছয়টি দেশের একটি হতে পেরেছে।
এই গৌরব ধরে রাখাই এখন সময়ের দাবি।
