দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধিতে অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সরবরাহ ও সংগ্রহ প্রক্রিয়ার ব্যর্থতাকে দায়ী করলেন ডা. রফিকুল ইসলাম। জানুন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের বর্তমান চিত্র।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে শিশুদের মধ্যে হামের (Measles) আশঙ্কাজনক প্রাদুর্ভাবের পেছনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অদূরদর্শিতা এবং টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকে দায়ী করা হচ্ছে। বিশেষ করে, প্রচলিত ও সফল পদ্ধতি বাদ দিয়ে নতুন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টিকা কেনার চেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে দেশের টিকাদান কর্মসূচি (EPI) বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার দুপুরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম সংবাদিকদের সামনে এই সংকটের নেপথ্য কারণগুলো তুলে ধরেন।
রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে শুরু, ছড়াল দেশজুড়ে
তদন্তে উঠে এসেছে যে, ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে বিষয়টি জানা থাকলেও যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব হয়েছে।
সাধারণত হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ; একজন আক্রান্ত শিশু থেকে অতি দ্রুত ১০ থেকে ১৫ জন শিশু সংক্রমিত হতে পারে।
সময়মতো ভ্যাকসিনেশনের ‘কভারেজ’ নিশ্চিত করতে না পারায় এটি এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।
টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় ‘ব্যর্থ’ পরীক্ষা-নিরীক্ষা
ডা. রফিকুল ইসলাম অভিযোগ করেন যে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে টিকা সংগ্রহের একটি সুনির্দিষ্ট ও সফল আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া ছিল।
কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই পথ পরিহার করে ভিন্ন একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেয়।
এই প্রক্রিয়াগত পরিবর্তনের ফলে ভ্যাকসিন সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন এবং প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।
এর ফলে নিয়মিত টিকাদান ব্যাহত হওয়ায় সংক্রামক ব্যাধি বিস্তারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে।
রামেক হাসপাতালের করুণ চিত্র: শয্যার চেয়ে রোগী দ্বিগুণ
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রচণ্ড চাপের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী:
- নির্ধারিত শয্যা: ১,২০০টি।
- বর্তমান রোগী: ২,৯০০ জনের বেশি।
- আইসিইউ পরিস্থিতি: শিশুদের জন্য নির্ধারিত আইসিইউতে বর্তমানে ১২ জন শিশু গুরুতর অবস্থায় ভর্তি রয়েছে।
পরিদর্শন শেষে ডা. রফিকুল ইসলাম জানান, হাসপাতালের সীমিত জনবল ও সরঞ্জাম দিয়ে এই বিশাল সংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা।
যদি প্রাথমিক পর্যায়ে টিকাদানের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তবে হাসপাতালের আইসিইউ এবং জেনারেল ওয়ার্ডের ওপর এই অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতো না।
হামের ধরনে পরিবর্তন? নতুন গবেষণার দাবি
বর্তমানে জাতীয় টিকাদান তফশিল অনুযায়ী শিশুদের ৯ মাস এবং ১৫ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়।
তবে ডা. রফিকুল ইসলাম এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, বর্তমানে চার মাস বয়সী শিশুরাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে।
এটি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য একটি বড় দুশ্চিন্তার বিষয়।
তিনি বলেন, “নির্ধারিত সময়ের আগেই কেন শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে, তার কারণ খুঁজে বের করতে দ্রুত গবেষণার প্রয়োজন। ভাইরাসের ধরনে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না বা টিকা সংগ্রহের বিলম্বের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।”
সময়োপযোগী গবেষণা ছাড়া এই মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
শিশু মৃত্যুর তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি
রামেক হাসপাতালে সম্প্রতি বেশ কিছু শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার একটি তিন সদস্যের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
কমিটির সদস্যরা ইতোমধ্যে হাসপাতালে তাদের অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছেন।
হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম জানান, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া গেলে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
তবে চিকিৎসকদের প্রাথমিক ধারণা, দেরি করে হাসপাতালে আসা এবং পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুদের জটিলতা বাড়ছে।
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা ও দ্রুত পদক্ষেপ
হামের মতো সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।
ডা. রফিকুল ইসলাম অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান যে, শিশুর শরীরে র্যাশ বা জ্বরের লক্ষণ দেখা দিলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে হবে।
একই সাথে তিনি সরকারকে জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে দ্রুততম সময়ে টিকার সরবরাহ স্বাভাবিক করার অনুরোধ জানান।
প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার অভাব?
একটি দেশের টিকাদান কর্মসূচি যেখানে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল, সেখানে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের অছিলায় শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উচিত হবে পূর্ববর্তী সফল পদ্ধতিগুলো বজায় রেখে জনস্বাস্থ্য রক্ষা করা।
হামের এই প্রাদুর্ভাব কেবল একটি রোগ নয়, বরং এটি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার ফাটলগুলোকেও স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপই পারে এই মহামারি থেকে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে।
