রাজধানীর বাজারে চাল, মুরগি ও সবজির দামে চরম অস্থিরতা। সোনালি মুরগি ৪৫০ ও চালের কেজিতে বেড়েছে ৭ টাকা। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস।
রাজধানীর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তির ছিটেফোঁটাও নেই। সপ্তাহের ব্যবধানে চাল, মুরগি এবং প্রায় সব ধরনের সবজির দাম আরেক দফা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের মাসিক বাজেটে বড় ধরনের ধস নেমেছে। শুক্রবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পণ্যের দামই এখন সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বিশেষ করে সোনালি মুরগি এবং চালের দামের লাফিয়ে বাড়া মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোকে চরম সংকটে ফেলেছে।
সোনালি মুরগির আকাশচুম্বী দাম: এক লাফে কেজি ৪৫০!
আমিষের চাহিদা মেটানোর অন্যতম উৎস মুরগির বাজারে এখন রীতিমতো আগুন।
শুক্রবারের বাজার চিত্রে দেখা যায়, প্রতি কেজি সোনালি মুরগির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বর্তমানে এক কেজি সোনালি মুরগি কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৪৩০ থেকে ৪৫০ টাকা।
অন্যদিকে, ব্রয়লার মুরগির কেজিতেও ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে ব্রয়লার।
গরুর মাংসের দাম অনেক আগে থেকেই সাধারণের নাগালের বাইরে, যা বর্তমানে ৮০০ টাকা কেজিতে স্থিতিশীল রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, খামারে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
চালের বাজারে ‘সরবরাহ সংকট’: কেজিতে বাড়ল ৭ টাকা
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে চালের দাম বৃদ্ধি।
বাজারে পর্যাপ্ত চালের মজুদ থাকার কথা থাকলেও ব্যবসায়ীরা ‘সরবরাহ সংকটের’ অজুহাত তুলে সব ধরনের চালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
- সরু চাল (নাজিরশাইল/মিনিকেট): কেজিতে ৭ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন-আয় নিশ্চিত করা মানুষের পাতে ভাত জোটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
- মোটা চাল: সাধারণ মানুষের প্রধান এই চালের দামও এখন উর্ধ্বমুখী।
ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই রকম; আগের সেই বাড়তি দামেই বাজারে সয়াবিন ও পাম তেল বিক্রি হচ্ছে।
সবজির বাজারেও নেই স্বস্তি: ৭০ টাকার নিচে কিছু নেই
কাঁচাবাজারে সবজির পসরা সাজিয়ে বসলেও দাম শুনে ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে।
হাতেগোনা দুই-একটি সবজি ছাড়া প্রায় সব সবজির কেজি এখন ৭০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বাড়তি সবজির দামও। বেশিরভাগ সবজি মিলছে ৭০-১০০ টাকায়।
প্রতি কেজি পটল ৮০ টাকা, মরিচ ১২০, উচ্ছে ১০০, বরবটি ১০০, ঢ়েরস ৮০ টাকা, লেবু প্রতি হালি ৫০-৬০, টমেটো ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছ।
ক্রেতারা বলছেন, আগে ১০০ টাকায় যে ঝুলি ভর্তি বাজার করা যেত, এখন তা একটি বা দুটি সবজি কিনতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
কেন এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি?
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূল কারণ।
তবে বিক্রেতাদের দাবি ভিন্ন।
কারওয়ান বাজারের এক সবজি বিক্রেতা বলেন,
“পাইকারি বাজারে মাল কম আসছে, আবার এলেও দাম চড়া। আমরা যদি বেশি দামে কিনি, তবে কম দামে বেচব কীভাবে?”
তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজার তদারকিতে প্রশাসনের কোনো কঠোর ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। ফলে ব্যবসায়ীরা যখন খুশি তখন পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
ভোক্তাদের প্রতিক্রিয়া: পকেট যখন শূন্য
বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী আমিনুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বেতন তো বাড়ে না, কিন্তু প্রতি শুক্রবার বাজারে এলে দেখি চাল-ডাল-সবজির দাম নতুন করে বেড়েছে। আগে সপ্তাহে একদিন মাংস খেতাম, এখন সেটাও বাদ দিতে হচ্ছে। বাজারের এই আগুন কীভাবে নিভবে তা কেউ জানে না।”
অন্য এক ক্রেতা জানান, লেবুর হালি ৫০-৬০ টাকা হওয়া মানে সাধারণ শরবত টুকু খাওয়ার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলছেন মানুষ।
প্রয়োজন কঠোর বাজার মনিটরিং
দ্রব্যমূল্যের এই উর্ধ্বগতি রোধে কেবল আশ্বাস নয়, বরং মাঠ পর্যায়ে কঠোর অভিযানের প্রয়োজন বলে মনে করেন সাধারণ মানুষ।
চালের মিলগেট থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এই রমজান পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান স্বাভাবিক রাখতে এবং পুষ্টির চাহিদা নিশ্চিত করতে সরকারকে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।
