ইউএনডিপির অর্থায়নে ‘ব্যালট’ প্রকল্পে ৬ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ, সুজন ট্রাস্টের বিরুদ্ধে জাল ভাউচার ও দুর্নীতির তদন্ত।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি United Nations Development Programme (ইউএনডিপি) অর্থায়নে পরিচালিত ‘ব্যালট’ নামের একটি প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ট্রাস্ট, যার নেতৃত্বে রয়েছেন বদিউল আলম মজুমদার। অডিটে প্রকল্পের বিপুল অর্থ অপব্যবহার ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠে আসায় বিষয়টি এখন এনজিও খাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
প্রকল্পের কাঠামো ও ব্যয়
‘ব্যালট’ প্রকল্পটির মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয় করা হয় বিভিন্ন প্রচারণামূলক কার্যক্রমে।
প্রকল্পের মূল বৈশিষ্ট্য:
- দেশের ৬৪ জেলায় ‘ইয়ুথ অ্যাম্বাসেডর’ নিয়োগ
- প্রতি অ্যাম্বাসেডরকে প্রায় দেড় লাখ টাকা প্রদান (আড়াই মাসের জন্য)
- তরুণ ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও গণভোটে অংশগ্রহণে উৎসাহ
প্রতিটি জেলায় অন্তত ৫ হাজার তরুণ ভোটারকে প্রভাবিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
অডিটে উঠে আসা অনিয়ম
প্রকল্প শেষে ইউএনডিপির অডিটে বড় ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। অভিযোগ অনুযায়ী—
প্রধান অনিয়মগুলো:
- প্রায় ৮০% বিল ও ভাউচার জালিয়াতির মাধ্যমে দাখিল
- প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
- সরকারের প্রাপ্য ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধ না করা
- ব্যয়ের স্বচ্ছতার অভাব
এই অনিয়মগুলো প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
কর্মকর্তার পদত্যাগ ও বিতর্ক
প্রকল্পে অনিয়ম প্রকাশ্যে আসার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একরামুল হক পদত্যাগ করেন। জানা গেছে, তিনি পূর্বে Transparency International Bangladesh (টিআইবি) এবং সনাকের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তবে ইউএনডিপি এই পদত্যাগকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে না; বরং এটি অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার প্রচেষ্টা হতে পারে বলেও সন্দেহ করছে।
পদত্যাগের পর প্রকল্প সংশ্লিষ্ট দায়িত্ব গ্রহণ করেন দিলীপ কুমার নামের আরেক কর্মকর্তা।
এনজিও খাতে প্রতিক্রিয়া
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশের এনজিও খাতে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে, সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠায় অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে—
- এটি এনজিও খাতের বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত হানতে পারে
- আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় কঠোরতা বাড়তে পারে
- ভবিষ্যতে প্রকল্প অনুমোদনে বাড়তি নজরদারি আসতে পারে
জবাবদিহি ও তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এই অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। কারণ আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
করণীয় হিসেবে প্রস্তাব:
- স্বাধীন অডিট ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত
- দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা
- ভবিষ্যতে অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
- আন্তর্জাতিক সংস্থার তদারকি জোরদার করা
‘ব্যালট’ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ শুধু একটি সংগঠন বা প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৃহত্তরভাবে সুশাসন, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।
অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে তা শুধু সংশ্লিষ্টদের জন্য নয়, বরং দেশের এনজিও খাতের জন্যও বড় ধরনের ধাক্কা হতে পারে। তাই দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র উদঘাটন করা এখন সময়ের দাবি।
