নির্বাচিত ব্যাঙ্গ কলামঃ
বিদ্যুৎ সংকটে কপাল খুলল আইপিএস ও মোমবাতি খাতের। রহিম আফরোজ ও সিঙ্গারের মতো প্রতিষ্ঠানে অর্ডারের হিড়িক। অন্ধকারের মাঝে নতুন এক ‘শিল্প বিপ্লব’-এর গল্প।
দীর্ঘ এক দশকের ‘অলস’ সময় কাটিয়ে অবশেষে সুদিনের দেখা পেয়েছে দেশের আইপিএস, ব্যাটারি এবং মোমবাতি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। গত কয়েক বছর ধরে দেশে বিদ্যুতের আধিক্যের কারণে যেসব কোম্পানি তাদের উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৯০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল, বর্তমান জ্বালানি সংকটের ‘সুদূরপ্রসারী’ প্রভাবে তারা এখন হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। রাজধানীর সায়দাবাদ থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় ইলেকট্রনিক্স শোরুমগুলোতে এখন উপচে পড়া ভিড়—তবে তা এসি বা ফ্রিজের জন্য নয়, বরং আইপিএস আর ব্যাটারির জন্য।
সিঙ্গার ও রহিম আফরোজের ‘ব্যস্ততা’: জোগানে হিমশিম
এক সময় যেসব আইপিএস কোম্পানি শোরুমের কোণায় ধুলো জমা অবস্থায় পড়ে থাকত, বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার কল্যাণে সেগুলো এখন হট-কেক। সিঙ্গারের কান্ট্রি ডিরেক্টরের এক ঘনিষ্ঠ সূত্র থেকে জানা গেছে, অর্ডারের চাপে তারা এখন দিশেহারা। বিশেষ করে ব্যাটারি প্ল্যান্টগুলো চাহিদার সাথে জোগান দিতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। রহিম আফরোজ ও হ্যামকোর মতো কোম্পানিগুলোর কারখানায় এখন দিন-রাত শিফট করে কাজ চলছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন থাকায় আইপিএস শিল্প প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু বর্তমানের লোডশেডিং পরিস্থিতি এই শিল্পে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। একেই বলে সত্যিকারের ‘চাঙ্গা বাজার’!
মোমবাতি শিল্পে নতুন জোয়ার: নস্টালজিয়ায় ভাসছে দেশ
২০০২ সালের সেই বিখ্যাত স্লোগান— “খালেদা জিয়ার রাজনীতি, সন্ধ্যার পরে মোমবাতি”—আবারও জনমুখে ফিরতে শুরু করেছে।
রাজধানীর সায়েদাবাদ ও চকবাজারের মোমবাতি কারখানাগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ।
লোডশেডিংয়ের ঘন অন্ধকারে মোমবাতির টিমটিমে আলোয় হারানো দিনের সেই নস্টালজিয়া খুঁজে পাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
সরকার প্রধানের ‘সুচিন্তিত’ পরিকল্পনায় মোমবাতি ও আইপিএস শিল্পের লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়েছে বলে মনে করছেন একদল বিশ্লেষক।
তাদের মতে, বিদ্যুৎ না থাকলেও দেশজ কুটির শিল্প ও ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ শিল্প এভাবে চাঙ্গা হওয়া অর্থনীতির এক অনন্য মডেল।
“আই হ্যাভ এ প্ল্যান!”: বিদ্যুতের বিকল্প যখন মোমবাতি
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কেন এই ভয়াবহ লোডশেডিং? উত্তরটা হয়তো সরকারের গোপন কোনো অর্থনৈতিক কৌশলের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
সমালোচকরা শ্লেষের সুরে বলছেন, হয়তো সরকার প্রধান আগেই ভেবেছিলেন—বিদ্যুৎ গেলে কী হবে? আমাদের দেশি আইপিএস আর মোমবাতি শিল্প তো চাঙ্গা হবে!
বিদ্যুৎ সাশ্রয় আর দেশি শিল্প বাঁচানোর এই অদ্ভুত মেলবন্ধন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনার তুঙ্গে।
ব্যবহারকারীরা বলছেন, “লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে মোমবাতি জ্বালিয়ে আমরা সেই সোনালী অতীতকে ফিরে পেয়েছি। ধন্যবাদ সরকারকে এই ঐতিহাসিক সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।”
বাজারের অস্থিরতা বনাম আইপিএস-এর রমরমা
যখন চাল, ডাল আর তেলের দামের চাপে মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন আইপিএস কেনা অনেকের জন্য বিলাসিতা হলেও প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ তা কিনতে বাধ্য হচ্ছে।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন তাদের জমানো টাকা খরচ করছে আইপিএস কিনতে, যাতে অন্তত রাতের বেলাটুকু গরমে সিদ্ধ হতে না হয়।
ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটগুলোও এই সুযোগ হাতছাড়া করছে না। ব্যাটারির দাম আগের চেয়ে অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ করার সময় নেই—জোগান যে সীমিত!
মোমবাতি জ্বালান, শিল্প বাঁচান!
বিদ্যুতের গ্রিড ট্রিপ করুক বা জ্বালানি ফুরিয়ে যাক—মোমবাতি আর আইপিএস শিল্পের এই ‘বিপ্লব’ থামার কোনো লক্ষণ নেই।
বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে নতুন স্লোগান উঠেছে— “মোমবাতি জ্বালান, শিল্প বাঁচান!”।
অন্ধকারের এই উৎসব কতদিন চলবে তা কেউ জানে না, তবে রহিম আফরোজ আর সিঙ্গারের মতো কোম্পানিগুলো যে কয়েক বছরের ব্যবসা কয়েক সপ্তাহেই সেরে নিচ্ছে, তা নিশ্চিত।
ভবিষ্যতে হয়তো এই লোডশেডিং কালকে ‘আইপিএস-এর স্বর্ণযুগ’ হিসেবে ইতিহাসে লেখা থাকবে।
